যেদিন শ্রেণীকক্ষে প্রজাপতিরা এসেছিল

Translate this post

দিনটা আর পাঁচটা দিনের মত ছিল না। বছরের পর বছর ধরে তারে জমিন পর সিনেমার মতো ছবি আমাদের মনে দাগ কেটেছে। আমাদের একটা ছোট্ট স্বপ্ন ছিল। আমাদের একটা ছোট্ট স্বপ্ন ছিল। আমরা শিশুদের ভরা কোনো শ্রেণীকক্ষে যাব। তাদের সাথে এমন কিছু গল্প করব যা তাদের কল্পনাকে আরও রঙিন করে তুলবে। সেই স্বপ্ন এক দুপুরে সত্যি হলো। আনন্যা দি ফোন করলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমি (শুভেন্দু) আর অঙ্কিত কি পুরুলিয়া জেলার একটি গ্রামীণ প্রাথমিক স্কুলে যেতে পারি?‌ বিদ্যালয়টির নাম ছিল বিন্দুইডি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমাদের কাজ ছিল সেখানকার ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীদের জন্য জীববৈচিত্র্য এবং প্রজাপতির জাদুকরী জগৎ নিয়ে একটি সেশন করা।

আমরা কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু তারপরেই আমরা একটা বড় সমস্যার মুখোমুখি হলাম। মাত্র চার থেকে নয় বছরের বাচ্চাদের সাথে কীভাবে কথা বলা যায়? শুধু তথ্য বা পরিসংখ্যান দিয়ে তো কোনো লাভ হবে না। নিজেদের মধ্যে অনেক আলোচনার পর আমরা একটা উপায় খুঁজে পেলাম। আমরা ঠিক করলাম, শুধু তথ্য নয়, বরং বাচ্চাদের জন্য ছবি, রঙ আর অনেক গল্প নিয়ে যাব।

উইকি লাভস বাটারফ্লাই প্রকল্পে ১৭,০০০-এরও বেশি ছবি রয়েছে। আমরা সেই ছবির ভান্ডারে ডুব দিলাম। সেখান থেকে আমরা আমাদের সবচেয়ে পছন্দের ১০০ টা ছবি বেছে নিলাম।

বিন্দুইডির পথে

সেশনের আগের দিন সন্ধেবেলা। আকাশে ছিল বর্ষার মেঘ, আর রাস্তা জুড়ে ঝিরঝির বৃষ্টি। আমরা ব্যাগ গুছিয়ে বাইকে চড়ে বেরিয়ে পড়লাম। এরই মধ্যে আমরা ব্যাগ গুছিয়ে বাইকে চেপে বেরিয়ে পড়লাম।​ এই যাত্রাপথটা একটা অ্যাডভেঞ্চারের থেকে কম ছিল না। ভেজা রাস্তা, বাতাসে ভরা পথ, আর মনে ছিল উল্লাস। ​সেই রাতে দেবশ্রী দি আর বোধিসত্ত্ব দা তাদের বাড়িতে আমাদের স্বাগত জানালেন। আমরা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে হাসাহাসি আর গল্প করছিলাম। প্রজাপতি, সংরক্ষণ, উইকিমিডিয়া জগৎ আর আগামী দিনের পরিকল্পনা—সবকিছু নিয়েই কথা হল। আর সাথে ছিল পরের দিনটা কেমন কাটবে, সেই ভাবনা।

আশিটি ছোট্ট সরল মুখ আর দুটি উদ্বিগ্ন মন

পরের দিন সকালে আমরা একটা ঘরে ঢুকলাম। ঘরটিতে প্রায় ৮০ জন শিশু ছিল। প্রত্যাশার আলোয় ওদের মুখগুলো ঝলমল করছিল।​ হঠাৎ করেই আমাদের বুকটা দুরুদুরু করে উঠল। আমরা বুঝতে পারছিলাম যে, এই ৮০টি কচি মন আমাদের উপর ভরসা করছে। ওদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলার দায়িত্বটা ছিল আমাদের।

আমরা প্রথমে জীববৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলা শুরু করলাম। সেখান থেকে ধীরে ধীরে স্থানীয় গাছপালার গল্পে চলে এলাম। তারপর, ঠিক যেন একটা ছবির বইয়ের পাতা ওল্টানোর মতো করে, আমরা তাদের প্রজাপতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। আমরা ওদের অনেক রঙ দেখালাম। অনেক গল্প শোনালাম।

আর তারপর একটা অসাধারণ ঘটনা ঘটল। পুরো ঘরটা বাচ্চাদের গুঞ্জনে গমগম করে উঠল। উত্তর দেওয়ার জন্য ওদের হাতগুলো একসাথে উপরে উঠে যাচ্ছিল। ওদের হাসির শব্দে ঘরের দেয়ালগুলো যেন মুখরিত হয়ে উঠল।

 তখন এটিকে আর শুধু একটা “বক্তৃতা” বলে মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, আমরা সবাই মিলে একসাথে নতুন কিছু আবিষ্কার করছি।

প্রজাপতিদের জগতে পদচারণা

গল্পের পর্ব শেষ হলে আমরা সবাইকে নিয়ে স্কুলের মাঠে গেলাম। উদ্দেশ্য ছিল, মাঠের মধ্যেই হেঁটে প্রকৃতিকে একটু কাছ থেকে দেখা। সেখানে অঙ্কিত নিচু হয়ে পাতার মধ্যে কিছু দেখাল। একটা কমন ব্যারন প্রজাপতি আর তার শুঁয়োপোকা। ওরা পাতার রঙের সাথে একদম মিশে ছিল। যে মুহূর্তে বাচ্চারা ওগুলোকে দেখতে পেল, বিস্ময়ে তাদের চোখ বড় হয়ে গেল। যেন ওদের নিঃশ্বাসটাও আটকে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, ছোট ছোট মানুষ আর ছোট্ট প্রাণীদের মধ্যে একটা নীরব সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।​ওদের উত্তেজনা ছিল ঠিক গুটি কেটে বেরিয়ে আসা কোনো প্রজাপতির মতো।

একবুক তৃপ্তি নিয়ে ফেরা

লেখিকা লোইস লাওরি একবার বলেছিলেন, “বাচ্চাদের এটা ভাবার অধিকার আছে যে, তারা চাইলে এই পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে।” আর এই স্বপ্নটাকে জাগিয়ে তোলার জন্য একটা গল্পের চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে?

আমরা সাথে করে একটা ছোট্ট গল্পের বই নিয়ে গিয়েছিলাম। বইটির নাম ‘শরতের সকাল ও তিন্নির গোপন বন্ধু’। এই মিষ্টি গল্পটা লিখেছিলেন সন্দীপ দা আর অনন্যা দি। এটি একটি ছোট্ট মেয়ে আর একটি প্রজাপতির জাদুকরী বন্ধুত্বের গল্প। ​বইটা ছাপানো হয়েছিল খুব সাধারণ একটা লিফলেটের উপর। কিন্তু তার মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল একটা আস্ত জগৎ।

অনুষ্ঠান শেষ করার আগে আমরা বাচ্চাদের ছোট্ট, আগ্রহী হাতে লিফলেটগুলো তুলে দিলাম। আর তখনই এক সুন্দর দৃশ্য তৈরি হলো। কেউ কেউ সঙ্গে সঙ্গেই সেটা খুলে পড়তে শুরু করল। মনে হচ্ছিল, ওরা যেন ইতিমধ্যেই তিন্নির জগতে হারিয়ে গেছে। আবার অন্যরা ওটাকে সযত্নে বুকে জড়িয়ে ধরল। দেখে মনে হচ্ছিল, ওরা যেন ভবিষ্যতের জন্য কোনো গুপ্তধন সঞ্চয় করে রাখছে।

আমরা জানি না এই গল্পটা ভবিষ্যতে আরও কত শত মানুষের কাছে পৌঁছাবে।​ কিন্তু আমরা এইটুকু জানি, আজ যে বাচ্চারা এই গল্পের ভেতরে বাস করছে, যারা তিন্নির সাথে কথা বলছে আর তার প্রজাপতির সাথে আকাশে উড়ছে, তারাই একদিন বড় হয়ে হাজার হাজার মানুষকে প্রেরণা যোগাবে।​ কারণ, কখনও কখনও একটা গল্পই যথেষ্ট—একটা শিশুকে শেখানোর জন্য যে, সেও পারে এই পৃথিবীটা বদলে দিতে।

অঙ্কিত গোস্বামী (সিসি‌ বাই এসে ৪.০)

অনুষ্ঠানটা যখন শেষ হলো, আমাদের কারোরই বিদায় জানাতে মন চাইছিল না। আমরা আমাদের ছবিগুলো গুছিয়ে নিলাম। বাচ্চাদের ছোট্ট হাতগুলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের আঁকড়ে ধরেছিল। আমরাও তাদের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানালাম। আমরা যখন ফিরছিলাম, মনে একটা আনন্দ-কষ্ট মেশানো অনুভূতি ছিল। আবার সেই বৃষ্টিভেজা রাস্তায় উঠলাম। কিন্তু তার অনেক পরেও আমাদের কানে ভাসছিল ওদের খিলখিল হাসির শব্দ আর শেষ না হওয়া সব প্রশ্ন।

বিন্দুইডি প্রাইমারি স্কুলের সেই সকালটা আমাদের একটা খুব সহজ কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। কখনও কখনও, শেখানোর শ্রেষ্ঠ উপায় হলো একটা গল্প বলা।​ আর কখনও কখনও, সবচেয়ে ছোট শ্রেণীকক্ষের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় সবচেয়ে বড় ডানাগুলো।

Can you help us translate this article?

In order for this article to reach as many people as possible we would like your help. Can you translate this article to get the message out?