লেন্স থেকে জ্ঞান: উইকি লাভস বাটারফ্লাই-এর হাত ধরে নাগরিক বিজ্ঞান

Translate this post

ছবি মানেই শুধু লেন্সের সামনের দৃশ্যের একটা ছাপ, এমনটা ভাবলে ভুল হবে। আসলে ছবি কখনোই নিছক কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনেকগুলো গল্পের পরত। কিছু গল্প তৈরি হয় ফটোগ্রাফারের নিজের দৃষ্টিভঙ্গি আর উদ্দেশ্য থেকে, আর কিছু গল্প ফ্রেমের ভেতরে নিজে থেকেই নীরবে ডালপালা মেলে। প্রকৃতি নিয়ে তোলা ছবির ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা আরও বেশি খাটে। সেখানে একটা ছবি শুধু দেখতে সুন্দর হলেই হয় না, সেটা হয়ে ওঠে জীববৈচিত্র্যের একটা জীবন্ত দলিল। একটা মাত্র ফ্রেমের ভেতরেই পুরো পরিবেশের ইতিহাস যেন বন্দি হয়ে থাকে। কোনো প্রজাতির পরিচয়, একটা নির্দিষ্ট জায়গা, ঋতুর বদল, এমনকি সেই এলাকার পরিবেশের খুঁটিনাটি বিষয়গুলোও স্থিরচিত্রের সেই একটা মুহূর্তেই মিলেমিশে এক হয়ে যায়।

মাঝে মাঝে ছবিতে প্রাণীদের নানারকম আচরণও নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে—এমন সব সূক্ষ্ম ভঙ্গি যা হয়তো এমনিতে আমাদের চোখ এড়িয়ে যেত। এভাবেই ছবিগুলো কেবল প্রকৃতির রূপ তুলে ধরে না, বরং তাকে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখে। এর ফলে একজন ফটোগ্রাফার কেবল নিছক দর্শক হয়ে থাকেন না, তিনি তথ্যের একজন বড় জোগানদার হয়ে ওঠেন। আপনার তোলা প্রতিটি খুঁটিনাটি ছবি এমন একটা ভাণ্ডার তৈরি করতে সাহায্য করে যা বিজ্ঞানীদের গবেষণায় কাজে লাগে, বিভিন্ন প্রজাতি চিনতে সুবিধা দেয় আর তারা কোথায় কেমনভাবে ছড়িয়ে আছে সেটা বুঝতেও পথ দেখায়। সময়ের সাথে সাথে এই ছবিগুলোই একেকটা অকাট্য প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি মাঝেমধ্যে এই ছবি থেকেই অনেক বিরল প্রজাতির হদিস মিলেছে, তৈরি হয়েছে পরিবেশ নিয়ে একদম নতুন কোনো রেকর্ড। স্রেফ এক পলক দেখার মাধ্যমে যা শুরু হয়, তা শেষমেশ অজানাকে জানার এক বড় কাজে পরিণত হয়। দিনের পর দিন ছবি তুলে রাখার এই নিঃশব্দ কিন্তু সুদূরপ্রসারী গুরুত্বটাই এখানে ফুটে ওঠে।

When photographers become part of citizen science through উইকি লাভস বাটারফ্লাইয়-এর হাত ধরে যখন ফটোগ্রাফাররা নাগরিক বিজ্ঞানের সাথে যুক্ত হন, তখন তাদের কাজটা স্রেফ সুন্দর ছবি তোলার চেয়েও অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিক বিজ্ঞান বলতে মূলত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে বোঝায়। পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো আর প্রকৃতি সংরক্ষণের কাজে এর গুরুত্ব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। উইকিমিডিয়া কমন্সের মতো উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে নিজেদের কাজ শেয়ার করা আর সেগুলোকে উইকিউপাত্ত কিংবা উইকিস্পিসিসের সাথে জুড়ে দেওয়ার ফলে তাদের তোলা এই তথ্যগুলো সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এই পদ্ধতিটা জ্ঞানকে সবার জন্য সহজলভ্য করে তোলে। এর ফলে ছাত্রছাত্রী, গবেষক থেকে শুরু করে দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তের প্রকৃতিপ্রেমীরা খুব সহজেই এই দরকারি তথ্যগুলো একদম বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ পান। এমনকি বড় বড় বিজ্ঞান সাময়িকী বা পিয়ার-রিভিউড জার্নালে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তুলে ধরতেও উইকি লাভস বাটারফ্লাই সাহায্য করে। এভাবেই সাধারণ মানুষ আর পেশাদার গবেষকদের মধ্যে একটা সেতুবন্ধন তৈরি হয়।

উইকি লাভস বাটারফ্লাইয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক ফটোগ্রাফারই হয়তো পতঙ্গবিজ্ঞান নিয়ে প্রথাগত পড়াশোনা করেননি। তা সত্ত্বেও তারা নিয়মিত আর পরিকল্পিতভাবে প্রজাপতির নানা প্রজাতির ছবি তুলে সেগুলো নথিবদ্ধ করার কাজটা চালিয়ে যান। তাদের তোলা জিওট্যাগ ছবি আর তার সাথে থাকা টুকিটাকি তথ্যগুলো সারা দুনিয়ার গবেষকদের কাজের জন্য এক বিশাল তথ্যের ভাণ্ডার তৈরি করতে সাহায্য করে। এর থেকে বোঝা যায়, বিজ্ঞান এখন আর কেবল চার দেয়ালের মাঝখানের কোনো বিষয় নয়। বরং সবার সম্মিলিত চেষ্টা আর ছড়িয়ে থাকা অগুন্তি মানুষের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বড় কোনো তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার দিকেই বিজ্ঞান এখন এগিয়ে যাচ্ছে।

ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই ধরনের কাজের চল ছিল ঔপনিবেশিক আমলেই। তখন প্রশাসনিক কর্মকর্তা আর শৌখিন প্রকৃতিপ্রেমীরা বিশাল এলাকা জুড়ে গাছপালা আর পশুপাখির তথ্য নথিবদ্ধ করতেন। যদিও সেই কাজগুলোর পেছনে সাম্রাজ্যবাদী প্রেক্ষাপট জড়িয়ে ছিল, তবুও তারা একটা বড় জিনিস প্রমাণ করেছিল—এক জায়গায় বসে না থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তথ্য সংগ্রহ করার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অনেক। ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন এই পুরো ধারণাটাই বদলে দিয়েছে। উইকি লাভস বাটারফ্লাইয়ের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো আলাদা আলাদা জায়গায় থাকা অনেক মানুষকে একসাথে কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। অল্প কিছু মানুষ মিলেই এখন হাজার হাজার ছবি আর তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারছেন। স্রেফ একা মাঠে নেমে প্রথাগতভাবে গবেষণা করে এত বিশাল কাজ করা সত্যিই বেশ কঠিন। এটাই আসলে সাধারণ মানুষের করা বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের দক্ষতা আর বড় কিছু করার সম্ভাবনাকে সবার সামনে তুলে ধরে।

পুরো এই কাজে ছবি খুব বড় একটা ভূমিকা রাখে। আজকাল স্মার্টফোন আর ভালো মানের ক্যামেরার কল্যাণে জীববৈচিত্র্যের খোঁজখবর রাখা অনেক সহজ হয়ে গেছে। প্রজাপতিরা দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি পরিবেশের হালচাল বুঝতেও তারা দারুণ সাহায্য করে। তাই লেন্সবন্দি করার জন্য প্রজাপতি একদম জুতসই একটা বিষয়। উইকি লাভস বাটারফ্লাইয়ের ফটোগ্রাফাররা স্রেফ চোখের আরামের জন্য সুন্দর ছবি তোলেন না; তারা এমন সব রেকর্ড তৈরি করেন যা অন্য তথ্যের সাথে মিলিয়ে যাচাই করা যায় আর বিজ্ঞানের বড় ভাণ্ডারে কাজে লাগানো যায়। নাগরিক বিজ্ঞানে তথ্যের মান এবং সঠিক হওয়াটা খুব জরুরি, আর ফটোগ্রাফারদের এই কাজগুলো ঠিক সেই লক্ষ্যটাই পূরণ করে।

উইকি লাভস বাটারফ্লাইয়ের আরেকটি জরুরি দিক হলো মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়ানো আর একে অপরের থেকে কিছু শেখা। নাগরিক বিজ্ঞানের এই প্রজেক্টগুলো শুধু তথ্য সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এগুলো আমাদের নতুন কিছু শেখা, হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করা আর বড় কোনো কাজে সবার অংশগ্রহণকেও বাড়িয়ে তোলে। উইকি লাভস বাটারফ্লাই মূলত এমন একটা প্ল্যাটফর্ম যেখানে সবাই সবার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়, কোনো প্রজাপতির প্রজাতি চিনতে একে অপরকে সাহায্য করে আর যারা নতুন কাজ শুরু করছে তাদের সঠিক পথ দেখায়। এই মিলেমিশে কাজ করার ধরণটা বিজ্ঞানের এক উন্মুক্ত জগত অর্থাৎ “রিপাবলিক অফ সায়েন্স“-এর প্রতিচ্ছবি যেখানে সবকিছুই একদম স্বচ্ছ, কাজের ক্ষেত্রে একে অপরের সাথে সরাসরি কথা বলা যায় আর নতুন কিছু খোঁজার জন্য সবাই এক হয়ে কাজ করে।

ছবির গুরুত্ব শুধু বিজ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষকে সচেতন করতে আর কোনো জরুরি বিষয়ে সবার নজর কাড়তে এর বড় ভূমিকা আছে। আমাদের পরিবেশের সূক্ষ্ম ভারসাম্য, প্রকৃতি বদলানোর নীরব সংকেত কিংবা জীববৈচিত্র্য বাঁচানোর গুরুত্ব, সবই এই ছবিগুলোর মাধ্যমে আমাদের চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে ধরা দেয়। প্রতিটি ছবির আড়ালে এমন এক আবেগ আর গল্প থাকে যা দর্শকদের স্রেফ দেখার গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রকৃতির প্রতি মায়া আর দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। বিভিন্ন প্রদর্শনী, প্রচার কর্মসূচি কিংবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে যখন এই ছবিগুলো মানুষের কাছে পৌঁছায়, তখন প্রকৃতির সাথে আমাদের একটা আত্মিক টান তৈরি হয়। এর ফলে আমরা পরিবেশের প্রতি আরও বেশি মনোযোগী আর যত্নশীল হয়ে উঠি।

এই সবকিছুর বিচারে দেখলে, উইকি লাভস বাটারফ্লাই স্রেফ ছবি তোলার কোনো প্রজেক্ট নয়; এটা আসলে এমন এক জায়গা যেখানে মনের কৌতূহল একটা বড় লক্ষ্যে বদলে যায়। এটা এমন একদল মানুষকে একজোট করে যারা একা একা নয়, বরং মাঠে নেমে হাতে-কলমে একে অপরের সাথে কাজ করতে করতে নতুন কিছু শেখে। শুরুটা হয়তো স্রেফ শখের বসে ছবি তোলা দিয়ে হয়, কিন্তু আস্তে আস্তে সেটা পরিবেশ নিয়ে পড়াশোনা, প্রকৃতি বাঁচানোর চেষ্টা আর সবার জন্য তথ্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার মতো বড় বড় কাজের সাথে জড়িয়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে এই ছবি তোলাটাই এক ধরনের বড় অংশগ্রহণে বদলে গেছে। এখানে প্রতিটি মানুষ আমাদের সবার জানার পরিধি বাড়াতে খুব দরকারি ভূমিকা রাখছে এবং এভাবেই তারা একেকজন প্রকৃত নাগরিক বিজ্ঞানী হয়ে উঠছে।

Can you help us translate this article?

In order for this article to reach as many people as possible we would like your help. Can you translate this article to get the message out?