উইকিস্কলার: স্কুল-স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের বিশেষ উদ্যোগ

Translate this post

শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্ত জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা, তাদের মনে অজানাকে জানার কৌতূহল জাগিয়ে তোলা এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬ সালে উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ আয়োজন করে স্কুল পর্যায়ের প্রথম কুইজ প্রতিযোগিতা—উইকিস্কলার । এতে ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের মোট ১৮টি স্কুল অংশ নিয়েছিল। এই আয়োজনের উদ্দেশ্য কেবল “সেরা” শিক্ষার্থী খুঁজে বের করা ছিল না, বরং তরুণ শিক্ষার্থীদের মুক্ত জ্ঞানের ধারণার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগত নিয়ে তাদের কৌতূহলী করে তোলাই ছিল আসল লক্ষ্য।

প্রতিষ্ঠার ২৫ বছরেরও বেশি সময় পার করে উইকিপিডিয়া এখন বিশ্বজুড়ে একটি পরিপক্ক অবস্থানে পৌঁছেছে। তবুও বাংলাদেশে সচেতনতার অভাব এখনো রয়ে গেছে—অনেক শিক্ষার্থীই এটি সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না, এমনকি কেউ কেউ এর নামও শোনেনি। শুরু থেকেই উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ এই শূন্যতা পূরণে কাজ করে যাচ্ছে। সীমিত সম্পদ আর নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও একদল নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক নিয়মিতভাবে মুক্ত জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার নানা উদ্যোগ নিয়ে চলেছেন। তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য সবসময়ই ছিল শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো—যাতে তারা কেবল কার্যকরভাবে উইকিপিডিয়া ব্যবহার করতে শেখে তাই নয়, বরং এটি কীভাবে তৈরি হয় সেই প্রক্রিয়াটিও বুঝতে পারে।

তবে এই কার্যক্রমগুলো দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা অনিয়মিতভাবেই চলে আসছিল। যেমন ধরুন, প্রায় এক দশক আগে ২০১৫ সালে বাংলা উইকিপিডিয়ার ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশের বেশ কিছু স্কুলে ‘মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল প্রোগ্রাম’ আয়োজন করা হয়েছিল। সেই উদ্যোগটি দেশে ও দেশের বাইরে সবখানেই বেশ প্রশংসা কুড়ায়। এরপর কমিউনিটির সবার বেশ আগ্রহ থাকলেও নানা কারণে এ ধরনের প্রোগ্রাম আর নিয়মিত আয়োজন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

উইকিস্কলারের ধারণাটি প্রথম আসে ২০২৫ সালের অক্টোবরে। রকি, মহীন রিয়াদ, এবং উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি আলী হায়দার খানের মধ্যে এক ঘরোয়া আড্ডায় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কুইজ প্রতিযোগিতা আয়োজনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। একটি সুশৃঙ্খল এবং প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উইকিপিডিয়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এই পরিকল্পনাটি কমিউনিটি বেশ দ্রুতই গ্রহণ করে। নভেম্বরের মধ্যেই এর সব পরিকল্পনা গুছিয়ে আনা হয় এবং অনুষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয় উইকিস্কলার

একটি পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে প্রতিযোগিতাটি শুরুতে ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল, কারণ দেশের সবচেয়ে সক্রিয় উইকিমিডিয়া স্বেচ্ছাসেবক দলগুলো এই দুই অঞ্চলেই রয়েছে। এর ফলে প্রথম বছরে পুরো বিষয়টি সমন্বয় করাটা বেশ সহজ হয়। যাতায়াত ও ব্যবস্থাপনার নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও সাড়া ছিল চোখে পড়ার মতো—ঢাকার ১০টি এবং রাজশাহীর ৮টি স্কুল থেকে প্রায় ১,০০০ শিক্ষার্থী এতে নিবন্ধন করেছিল। লিফলেট, পোস্টার আর সামাজিক মাধ্যমে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সব মিলিয়ে প্রায় ১০,০০০ শিক্ষার্থীর কাছে এই উদ্যোগটি পৌঁছাতে পেরেছিল।

বাংলা উইকিপিডিয়ার ভালো নিবন্ধ এবং নির্বাচিত নিবন্ধ তালিকা থেকে ১২টি নিবন্ধ প্রতিযোগিতার সিলেবাস হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল বেশ সহজ কিন্তু সুদূরপ্রসারী: শিক্ষার্থীদের ভালো মানের উইকিপিডিয়া কন্টেন্টের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাদের নিয়মিত পাঠক হিসেবে গড়ে তোলা।

পুরো প্রতিযোগিতাটি দুটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রথম ধাপে অনলাইন এবং অফলাইন পরীক্ষার মাধ্যমে স্কুল পর্যায়ে বাছাই কার্যক্রম চালানো হয়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে, বাছাইকৃত সেরা শিক্ষার্থীরা আঞ্চলিক ফাইনালে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল: ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি এবং নবম থেকে দশম শ্রেণি।

৪ এপ্রিল রাজশাহীতে এবং ১১ এপ্রিল ঢাকায় আঞ্চলিক পর্বের প্রতিযোগিতাগুলো অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি বিভাগ থেকে প্রথম তিনজনকে বই, ক্রেস্ট, স্যুভেনির এবং সনদপত্র প্রদানের মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হয়। প্রতিযোগীদের পাশাপাশি এই আঞ্চলিক আয়োজনে অভিভাবক এবং শিক্ষকরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে এটি নিয়মিত আয়োজন করার আশা প্রকাশ করেন।

প্রতিযোগিতা পরবর্তী প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা গেছে যে শিক্ষার্থীদের ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেরই আগে উইকিপিডিয়া ব্যবহারের তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না, আবার কারো কারো মনে এর তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে কিছুটা ভুল ধারণা ছিল। তবে এই প্রোগ্রামের পর তারা উইকিপিডিয়াকে জ্ঞানের একটি মূল্যবান ও সহজলভ্য উৎস হিসেবে চিনতে পেরেছে। এ নিয়ে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে একজন প্রতিযোগী লিখেছেন:

“আমার এই আয়োজনটি খুব ভালো লেগেছে। প্রতিটি ধাপ যে এত সুন্দরভাবে শেষ হবে, তা আমি ভাবতেও পারিনি। এর আগে কখনো কোনো অনুষ্ঠানে এত মজা পাইনি—বিশেষ করে স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যবহার ছিল এক কথায় চমৎকার।”

প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বেশ কিছু স্কুলে উইকিপিডিয়া কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছিল, যার মধ্যে দুটি ছিল আঞ্চলিক সেশন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ এবং অংশগ্রহণ করার মানসিকতা আরও বেড়েছে।

রাজশাহী, চাঁদপুর, ও ঢাকা উইকিমিডিয়া সম্প্রদায়ের স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই আয়োজনটি সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে ইয়াহিয়া, দেলোয়ার হোসেন, সাদমান সাকিব এবং সালাউদ্দিনকে তাদের নিরলস পরিশ্রমের জন্য বিশেষ ধন্যবাদ জানানো হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের এই উদ্দীপনা আর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। উইকিস্কলার কেবল সাধারণ কোনো কুইজ প্রতিযোগিতা নয়—এটি আসলে উইকিমিডিয়া আন্দোলনের সাথে যুক্ত হওয়ার একটি চমৎকার মাধ্যম। নিয়মিত চেষ্টা আর সময়ের সাথে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে এই উদ্যোগটি তরুণদের সম্পৃক্ত করার একটি টেকসই মডেলে পরিণত হতে পারে, যা বাংলাদেশে উইকিমিডিয়ার পরবর্তী প্রজন্মের অবদানকারী তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

Can you help us translate this article?

In order for this article to reach as many people as possible we would like your help. Can you translate this article to get the message out?