যেভাবে গ্ল্যাম প্রকল্প আমাকে অগতানুগতিক বিষয়ের উপর কিছু নিবন্ধ লিখতে সাহায্য করলো

Translate this post

উইকিমিডিয়ার প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় ও প্রাণবন্ত প্রকল্প হচ্ছে উইকিপিডিয়া। পাঁচ বছরের বেশি সময় হয়ে ধরে আমি উইকিপিডিয়ায় নিবন্ধ লেখা ও অনুবাদ করে যাচ্ছি। প্রথমদিকে ইংরেজি থেকে বাংলায় নিবন্ধ অনুবাদ করার প্রতি ঝোঁক বেশি থাকলেও এখন মূলত নতুন নিবন্ধ বেশি লেখা হয়ে থাকে।

গ্ল্যামের পূর্ণাঙ্গ রূপের একটি চিত্র, মূল তৈরিকারী SSoster (WMB), অনুবাদক MdsShakil, সিসি-বাই-এসএ ৪.০ লাইসেন্সে উইকিমিডিয়া কমন্সে আপলোডকৃত

উইকিপিডিয়ায় যে বিষয়গুলো আমার কাছে আকর্ষণীয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম তালিকা নিবন্ধ। আমার মতে যেকোনো বিষয়ের উপর দ্রুত তথ্য পেতে তালিকা একটি কার্যকর পাতা। আমি একজন বাংলাদেশী উইকিপিডিয়ান এবং আপনি যদি না জেনে থাকেন সেজন্য আপনার সুবিধার্থে বলে রাখি যে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীন হয়, তার পূর্বে অঞ্চলটি ছিল পাকিস্তানের একটি প্রদেশ যার নাম পূর্ব পাকিস্তান, ১৯৪৭ সালের আগে এই অঞ্চলটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক ভারতের বঙ্গ প্রদেশের একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মাত্র। আমি খেয়াল করেছিলাম যে উইকিপিডিয়ায় বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের তালিকা নিবন্ধ আছে। তবে উইকিপিডিয়ায় আমি বাংলাদেশের পূর্বসূরি পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক আইনসভার সদস্যদের তালিকা নিবন্ধের অভাব বোধ করতাম। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার আগে ব্রিটিশ শাসিত বঙ্গ প্রদেশের আইনসভা মূলত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট ছিল, উচ্চকক্ষের নাম বঙ্গীয় আইন পরিষদ এবং নিম্নকক্ষের নাম ছিল বঙ্গীয় আইনসভা। দুর্ভাগ্যবশত এই দুটি আইনি প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের তালিকা উইকিপিডিয়ায় নেই। এসব তালিকা ঐতিহাসিকভাবে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, মুক্ততথ্যের বিস্তার ঘটানোর জন্য এগুলো নিয়ে কাজ করাও জরুরি।

কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও আমি প্রথমদিকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের তালিকার জন্য নিবন্ধ তৈরি করতে পারিনি। কারণ অনলাইনে সদস্যদের তথ্য উন্মুক্ত ছিল না। তবে ব্রিটিশ আমলের বঙ্গীয় আইন সভার সদস্যদের কিছু তথ্য অনলাইনে পাওয়া যায় আইনসভার বক্তব্যের নথির পিডিএফ ফাইল থেকে। আমি বেশ কিছু ব্যক্তির জীবনীর নিবন্ধ লিখতে সেসব পিডিএফ নথি ব্যবহার করতাম। এরপর কোনো একদিন একজন উইকিপিডিয়ানের বরাতে জানতে পারলাম যে শুধু যে বঙ্গীয় আইনসভার বক্তব্যের নথিতেই আইনসভার সদস্যদের তালিকা পাওয়া যায় তা নয়, বেঙ্গল সিভিল লিস্টের নথিতেও পাওয়া যায়। এখানে আরেকটা বিষয় উল্লেখ করা জরুরি যে সিভিল লিস্ট ও বক্তব্যের নথিতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের তালিকাও আছে। যেহেতু আমি পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার তালিকা নিবন্ধ তৈরি করছিলাম সেহেতু সিভিল লিস্টের প্রয়োজন আমার কাছে অনেক বেশি ছিল।

তবে পূর্ব পাকিস্তানের সিভিল লিস্ট অনলাইনে উপলব্ধ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে কিছু সিভিল লিস্ট থাকলেও সেগুলো শুধু তাদের ছাত্ররাই পড়তে পারবে। আমি যেহেতু ঢাবির ছাত্র নই সেহেতু এগুলো আমার হাতে আসা সম্ভব ছিল না। চাইলে সংগ্রামের নোটবুকের মতো ঐতিহাসিক সংবাদপত্রের পিডিএফ ফাইল অনলাইন থেকে পড়ে মন্ত্রিসভা ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের তথ্য নিয়ে নিবন্ধ লেখা সম্ভব, কিন্তু সেটা বেশ সময়সাপেক্ষ আর খরচসাপেক্ষ। আমার এখনো মনে আছে যে, পাকিস্তানের ১৯৫৫ সালের গণপরিষদ নির্বাচনের নিবন্ধ লিখতে ঐতিহাসিক সংবাদপত্রের সাহায্য নেওয়ায় আমার কত সময় আর ইন্টারনেট খরচ হয়েছিল (হ্যাঁ, আমি মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করি যা সীমিত)। একটা সিভিল লিস্ট আমার ইন্টারনেট ও সময় বাঁচিয়ে দিতে পারে।

কাজের শুরু

১৯৬৩-৬৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান সিভিল লিস্টের প্রচ্ছদ, ব্যবহারকারী Usernameunique হতে ইমেইল যোগে প্রাপ্ত সিভিল লিস্টের পিডিএফ ফাইল থেকে

অনেকদিন ধরে ইন্টারনেটে সিভিল লিস্ট সার্চ করে খুঁজে না পেয়ে বেশ কিছুদিন পর আবার সার্চ দিয়ে উইকিমিডিয়া কমন্সে একটা পিডিএফ ফাইল নজরে এলো। ফাইলটি ছিল ১৯৫৫ সালের পূর্ব পাকিস্তান সিভিল লিস্টের। ফাইলটি ডাউনলোড করে দেখলাম সেখানে রয়েছে আবু হোসেন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্যদের একটি অসম্পূর্ণ তালিকা এবং ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের এক বছর আবু হোসেন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা আইনসভার সদস্যদের তালিকা। আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রিসভার নিবন্ধ সিভিল লিস্ট ব্যবহার করে তৈরি করলাম। তারপর ব্যবহারকারী R1F4T এর সাথে মিলে দ্বিতীয় পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের তালিকার নিবন্ধ বানিয়ে ফেলি। পরে জানতে পারি যে সিভিল লিস্টের পিডিএফ ফাইলটি আপলোড করেছে রাজশাহী উইকিমিডিয়া সম্প্রদায় একটি গ্ল্যাম উদ্যোগের অংশ হিসেবে।

উইকিপিডিয়া বলছে, গ্ল্যাম হচ্ছে “মূলত চিত্রশালা বা গ্যালারি, গ্রন্থাগার, আর্কাইভ এবং জাদুঘরসমূহের একটি সম্মিলিত সংক্ষিপ্ত রূপ। জনস্বার্থে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের কাছে জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই একক নামে অভিহিত করা হয়।” গ্ল্যাম নিয়ে আগেও অনেক কিছু জেনেছি। ২০২৫ সালে উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ আয়োজিত উইকি লিডার্স ট্রেনিংয়ে গ্ল্যামের ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছিল। রাজশাহী উইকিমিডিয়া সম্প্রদায় হাতেকলমে দেখিয়েছিল যে কিভাবে তারা গ্ল্যাম প্রকল্পের জন্য দুর্লভ নথিগুলো অত্যাধুনিক স্ক্যানার মেশিন দিয়ে স্ক্যান করে সংরক্ষণ করে। কিন্তু আমি একজন উইকিপিডিয়ান হিসেবে সবসময় ভাবতাম যে কিভাবে গ্ল্যাম প্রকল্পের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত সৃষ্টিকর্ম আসলে ব্যবহারিকভাবে উইকিপিডিয়া বা অন্যান্য সহপ্রকল্পে কাজে লাগানো যাবে।

উইকি লিডার্স ট্রেনিং ২০২৫-এর সেশনে রাজশাহী উইকিমিডিয়া সম্প্রদায় কিভাবে গ্ল্যামের কাজ করে তা হাতেকলমে দেখাচ্ছেন ব্যবহারকারী Tahmid, ছবিটি তুলেছেন Dolon Prova, যা উইকিমিডিয়া কমন্সে সিসি-বাই-এসএ ৪.০ লাইসেন্সে উন্মুক্ত রয়েছে

তো যাই হোক, সিভিল লিস্টের জন্য রাজশাহী সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ জানানোর পর সম্প্রদায়ের সদস্য Tahmid জানান তাদের কাছে ১৯৫৭ সালের সিভিল লিস্ট আছে যেটি তারা স্ক্যান করে শীঘ্রই আপলোড করবে। পরে সেটি ব্যবহার করে একটি মন্ত্রিসভার নিবন্ধ হালনাগাদ করেছিলাম। কিন্তু তারা আর কোনো সিভিল লিস্ট আর পায়নি। Tahmid বলেছিলেন যে তারা পাইওনিয়ার লাইব্রেরি থেকে শুধু ১৯৫৫ ও ১৯৫৭ সালের সিভিল লিস্ট পেয়েছিলেন। তাই আমার নিবন্ধ তৈরির কাজ এক জায়গায় গিয়ে আটকে যায়।

আশা পেলাম ফিরে

শেষ চেষ্টা হিসেবে আমি ইংরেজি উইকিপিডিয়ার উইকিপ্রকল্প রিসোর্স এক্সচেঞ্জের রিসোর্স রিকুয়েস্টে ১৯৫০-১৯৫৪ সালের সিভিল লিস্টের জন্য অনুরোধ করি। যদিও আমি ভেবেছিলাম যে হয়তো সাড়া পাওয়া যাবেনা, কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর Usernameunique সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন। তিনি নিজের ব্যস্ততার মাঝেও নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরিতে উপলব্ধ বেশ কয়েকটি সিভিল লিস্টের (১৯৫৩, ১৯৬৪, ১৯৬৮) প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠার স্ক্যান কপি আমাকে পিডিএফ আকারে ইমেইলে পাঠান, যার জন্য আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। রাজশাহী উইকিমিডিয়া সম্প্রদায়ের গ্ল্যাম প্রকল্প ও Usernameunique এর সহায়তায় আমি কয়েকটি তালিকা নিবন্ধ ও মন্ত্রিসভার নিবন্ধ তৈরি ও হালনাগাদ করতে অবশেষে সক্ষম হই (অবশ্য অল্প কিছু নিবন্ধ তৈরির জন্য বাধ্য হয়ে আমাকে ইস্ট ভিউ দক্ষিণ এশীয় সংবাদপত্র আর্কাইভের সাহায্য নিতে হয়)। কয়েক মাস ধরে নিবন্ধগুলো তৈরি ও হালনাগাদের কাজ আমাকে এটা বুঝিয়ে দেয় যে একটি গ্ল্যাম প্রকল্প আসলেই বিভিন্নভাবে আমাদের উইকিমিডিয়ার একাধিক প্রকল্পে সাহায্য করতে পারে।

কিন্তু প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে গ্ল্যাম এক্টিভিটির তীব্রতা ও কভারেজের উপর। যেমন গ্ল্যাম প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু রাজশাহী উইকিমিডিয়া সম্প্রদায়ের কাছ থেকেই শুধু দুইটা সিভিল লিস্ট পাওয়া গেছে, যদি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরো অনেক গ্ল্যাম প্রকল্প নিয়মিতভাবে চলমান থাকতো তাহলে হয়তো আরো সিভিল লিস্ট আমি রিসোর্স রিকুয়েস্টে অনুরোধ করা ছাড়া পেতে পারতাম (দেশের অন্যান্য উইকিমিডিয়া সম্প্রদায়ের অবদানকে এখানে প্রশ্নবিদ্ধ করিনি, সব জায়গায় সব সিভিল লিস্ট পাওয়া নাও যেতে পারে। সময় ও রিসোর্স সীমাবদ্ধতার কারণে সম্প্রদায়গুলো সর্বত্র যেতে পারবেনা সেটাই স্বাভাবিক। আর তাই আরো উইকিমিডিয়া সম্প্রদায় ও গ্ল্যাম প্রকল্প করা জরুরি)। আমার অবদানের অভিজ্ঞতা আমাকে দেখিয়েছে যে উইকিমিডিয়ার বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্ল্যাম প্রকল্প আরো বেশি প্রয়োজন। আগ্রহী পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক ও পর্যাপ্ত রিসোর্স পারে গ্ল্যাম প্রকল্প আরো বৃদ্ধি করতে।

আমি আশা করবো, অদূর ভবিষ্যতে গ্ল্যাম প্রকল্পের সক্রিয়তা উইকিমিডিয়া জগতে আরো বৃদ্ধি পাবে এবং এই লক্ষ্যে আমরা একে অপরকে সহযোগিতা করে যেতে পারবো।

Can you help us translate this article?

In order for this article to reach as many people as possible we would like your help. Can you translate this article to get the message out?