পূর্বাচলের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ফটোওয়াক

Translate this post

২৭ জুন, শনিবার একটি ফোনকল হঠাৎ আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। ঘুমন্ত অবস্থায় কলটি ধরে শুনতে পেলাম, “হাসনাত, আমরা সকাল ৭টায় আসছি, আপনি রেডি?” ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম তখন সকাল ৬টা ৪৫ মিনিট। বললাম, “হ্যাঁ, আমি চলে আসব।” ফোন করেছিলেন ইয়াহিয়া ভাই, যিনি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ফটোওয়াকের আয়োজন করেছিলেন। অনলাইনে খুব কম ছবিই মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

স্প্রিংয়ের মতো আমি বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে হালকাভাবে নিজের শয্যাকক্ষ গুছিয়ে নিলাম। বাথরুমের কাজ সেরে ব্যাগ হাতে তুলে নিলাম। অল্পস্বল্প চিন্তাভাবনা করে মনে হলো, বই নিলে সেটি বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে, তাই ব্যাগে বই নেওয়ার চিন্তা বাদ দিলাম।

পৌঁছাতে এক-দুই মিনিট দেরি হলেও মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে কার্যক্রমে যোগ দেওয়া যেমন-তেমন কথা নয়, তাই না?

“আপনার মনে হয় ঘুম পাইসে, ভাই।” বলেছিল আমার পাশে থাকা আমাদের ছোট ফটোওয়াক দলের সদস্য ইশতিয়াক। জবাবে বললাম, “হ্যাঁ, তবে সমস্যা নাই। তোমার কী অবস্থা?” যেহেতু আমরা সবাই বিভিন্ন একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছি, সেহেতু যেকোনো উইকি কার্যক্রমই আমাদের সবার একত্র হওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

এরই মধ্যে ইয়াহিয়া ভাই ক্যামেরা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর আমরা আমাদের দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যকে সঙ্গে নিলাম। তাকে দেখেও বেশ প্রস্তুত মনে হলো। আরও মনে হচ্ছিল, সে আমাদের সঙ্গে ফটোওয়াকে যাওয়ার জন্য আর অপেক্ষাই করতে পারছে না।

বেশ বড়সড় একটি ভ্রমণের পর আমরা আমাদের গন্তব্য পূর্বাচল সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পৌঁছালাম। আর কোনো আলাপ না বাড়িয়ে আমরা কাজে লেগে পড়লাম। সেই সকালের প্রতিটি মুহূর্তই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কেননা সময় ফুরিয়ে গেলে সূর্য আমাদের মাথার ওপর অবস্থান করবে। তাছাড়া এই মৌসুমে মনে হয়, আর্দ্রতার কারণে যেন আমাদের শরীরের সব পানিই বের হয়ে যাচ্ছে।

যেভাবে বাচ্চারা নতুন খেলনা পেলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, আমরাও ঠিক সেরকম হয়ে গেলাম। তারপর নিজ নিজ হাতে ছবি তুলতে শুরু করলাম। একটি পাখি দেখামাত্র আমরা একে অপরকে চুপ থাকার ইঙ্গিত দিয়ে নিঃশব্দে তার দিকে এগিয়ে গেলাম, ঠিক যেন শিকারিরা শিকারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

প্রায় দুই ঘণ্টা পর আমরা থামলাম। আমাদের রসদের প্রয়োজন ছিল। এছাড়া ফটোওয়াকের জন্য আমরা সকালের জলখাবার না খেয়েই বাসা থেকে বের হয়েছিলাম। তাই আমরা লোকালয়ে ফিরে গেলাম।

জলখাবার খেতে খেতে প্রায় সকাল ৯টা ২০ মিনিট বেজে গেল। মনে হচ্ছিল, সূর্য যেন ইতোমধ্যেই রেগেমেগে অগ্নিশর্মা হয়ে আমাদের চারপাশকে তপ্ত উনুনের মতো জ্বালিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সূর্যমামার সেই রাগকে আমরা থোড়াই কেয়ার করি! রসদ সংগ্রহের পর আমরা আবার বনে ফিরে গেলাম। রসদের অধিকাংশই ছিল পানির বোতল।

পুরো সকালজুড়ে আমরা কেবল বনের প্রান্তে ছবি তুলছিলাম। এবার বনের গভীরে যাওয়ার পালা। যেমন বলে, কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে; বনের ভেতরে প্রবেশ করার সময় আমারও ঠিক তেমন অনুভূতি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন মানুষের অবহেলায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে ধুঁকে চলা সেই পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক ভিন্ন জগতে প্রবেশ করেছি।

পাখিদের কিচিরমিচির, পোকামাকড়ের ঝিঁঝিঁ ধ্বনি, শুকনো পাতায় পাখিদের খাদ্য খোঁজার শব্দ, বেজি ও গুইসাপের আচমকা ঘোরাঘুরি, শালগাছের ফাঁক গলে বয়ে যাওয়া শীতল বাতাসের মৃদু সুর আর চারপাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শান্তির স্পর্শ… সব মিলিয়ে যেন সময় থমকে দাঁড়িয়েছিল। মনে হচ্ছিল, শহরের ব্যস্ততা ও বিশৃঙ্খলার বিপরীতে প্রকৃতি আমাদের সামনে এক নতুন বাস্তবতা তুলে ধরেছে, যার অস্তিত্ব যেন আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম। এসব দেখে আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়লেও নিজেদের কাজ ভুলে যাইনি। সাধ্যানুযায়ী সবকিছুরই ছবি তুলেছি।

কেউ একজন প্রশ্ন করেছিল, আমরা যেসব ছবি ইতোমধ্যেই উইকিমিডিয়া কমন্সে রয়েছে তাদের ছবি কেন তুলছি। ইয়াহিয়া ভাই প্রশ্নটির উত্তর দিয়েছিলেন। সংক্ষেপে তার বক্তব্য ছিল: জীববৈচিত্র্যের প্রভাবে স্থান, পরিবেশ, জনমিতি, টপোলজি প্রভৃতির ভেদে একই প্রজাতিও ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারে। তাছাড়া কে জানে, হয়তো আমরা নতুন কোনো জাতই আবিষ্কার করে ফেলতে পারি। যেহেতু আমি সাইটোজেনেটিক্স ও মিউটেশন নিয়ে পড়াশোনা করেছি, তাই বিষয়টি আমার কাছে বেশ পরিচিত।

তো আমরা এগুতে থাকলাম। এরই মধ্যে শত শত মশার কামড়ের স্বাদ গ্রহণ করতে বাধ্য হলাম। অন্যদিকে ইয়াহিয়া ভাই বনবিড়ালের মতো দেখতে একটি প্রাণি দেখতে পেয়েছিলেন, তবে ছবি তোলার আগেই সেটি পালিয়ে যায়। আমি একটি ছোট পোকা খুঁজে পাই, যেটি দেখতে হুবহু একটি ছোট পাতার মতো। ওটি সম্ভবত পাতাফড়িং। এছাড়া একটি অত্যন্ত অধ্যবসায়ী কেঁচো, একটি ছোট্ট ব্যাঙ, কয়েকটি গঙ্গাফড়িং এবং একটি পোকাকে আরেকটি শিকারি পোকা ভক্ষণরত অবস্থায় দেখতে পাই।

ছবিটি জুম করামাত্র আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নৃশংসতার একটি নমুনা দেখতে পাবেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহ, উইকিমিডিয়া কমন্সে সিসি বাই-এস ৪.০ লাইসেন্সে উন্মুক্ত।

সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, যতক্ষণ না খেয়াল করলাম আমাদের পানি প্রায় শেষের পথে। কিন্তু গহিন বনে পানি পাব কোথায়? আরেকটি বিষয়ও চোখে পড়ল, যা আমাদের এই সমস্যার চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক। কিছু অসাধু মানুষ বনে এসে তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র এখানে-সেখানে ফেলে রেখে গেছে। প্রকৃতির কাছ থেকে এত কিছু নিয়ে বিনিময়ে তোমরা তাকে প্লাস্টিক উপহার দিচ্ছ? তবে স্বস্তির বিষয়, বনে প্লাস্টিকের পরিমাণ খুব বেশি ছিল না; অল্প কিছুই ফেলে রেখে গিয়েছিল।

যাই হোক, আমরা ফিরে গেলাম। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে আমি বন্যপ্রাণী ও গাছপালার ছবি তোলার দিকেই গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছিলাম। আরাফ ও ইশতিয়াক প্রকৃতির পাশাপাশি আমাদের ছবিও তুলছিল। ইয়াহিয়া ভাইও আমাদের আশপাশের দৃশ্যের ছবি অধিকাংশ তুলেছিলেন।

কিছু সময় খাওয়াদাওয়া ও বিশ্রামের পর মনে হচ্ছিল, যেন আমাদের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। এমন অনুভূতি হওয়াই স্বাভাবিক, কেননা আমরা কেউই পেশাদার পদযাত্রাকারী নই। কিন্তু বনের আরও কিছু অংশের ছবি তোলা বাকি ছিল। তাই আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। সেখানে গরম ছিল অসহ্য, তাই দ্রুত হাঁটতে লাগলাম, যেন যত দ্রুত সম্ভব বনের গভীরে পৌঁছাতে পারি, যেখানে গাছের ছায়ায় সূর্যের তাপ অনেকটাই কমে যায়। ঠিক যেমনটা ভেবেছিলাম, তাপও কিছুটা কমে গেল। কয়েক মিনিট এগোনোর পর আমরা ঝিলের মতো দেখতে একটি জলাধারের সামনে এসে পড়লাম।

আহ, কী সুন্দর! আমি নিশ্চিত, কেউ যদি ছোটবেলা থেকে এখানে বসবাস করে, তবে এই জায়গা তাকে কবি বানিয়েই ছাড়বে। বকগুলো সতর্ক দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে আছে। ভাসমান পোকামাকড়, জলফড়িংয়ের নিরন্তর উড়ে বেড়ানো, মাছের সন্ধানে কাঠঠোকরার বিচরণ, ঝিলের চারপাশে কালো ফিঙের ছুটে বেড়ানো, আর দূরে ঈগল ও শাহীনের মতো কয়েকটি অচেনা পাখির দেখা… সব মিলিয়ে এক অপার্থিব পরিবেশ। এমনকি ঝিলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কচুরিপানাগুলোও যেন এই পৃথিবীর নয়।

এই স্বর্গসম জায়গাটির যত সম্ভব ছবি তুলে আমরা আরও গভীরে রওনা দিলাম। ফেরার পথে ইশতিয়াক আঘাত পেয়েছিল। সে তার আঘাতকে তেমন গুরুত্ব দিতে না চাইলেও আমরা বনে থাকা কিছু ঔষধিগুণসম্পন্ন বুনো লতা ব্যবহার করে তার প্রাথমিক চিকিৎসা করি।

সূর্যাস্তের সময় প্রায় হয়ে এসেছিল। অন্ধকার নামতে আর মাত্র দুই ঘণ্টা বাকি, তাই আমরা বাধ্য হয়ে আমাদের নির্ধারিত সূচনাস্থলে ফিরে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার দৈনন্দিন জীবনে ফিরে আসি।

আমরা সেই এলাকার এক স্থানীয় কৃষকের সঙ্গেও কথা বলি। তার কাছে আমরা আমাদের কাজের উদ্দেশ্য তুলে ধরেছিলাম। তার একটি ছবি তুলে দেখানোর পর তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন।

সেদিন আমি এমন এক প্রতিজ্ঞা নিয়েই ছবি তুলছিলাম, যেন আমার সামনে স্বয়ং বাঘমামাও উপস্থিত হলে ছবি তোলা বন্ধ করব না। যদিও সেদিন মামার দেখা পাইনি, অজানা ক্ষতিকর জীবের হামলার আশঙ্কা আমাদের সবসময় ঘিরে ছিল। তবু সেই ভয়কে সঙ্গী করেই আমরা ফটোওয়াক চালিয়ে গিয়েছি। সে হিসেবে সাহসের জন্য আমরা শতভাগ কৃতিত্ব পেতেই পারি।

সেই দিনের কথা পড়লে আজও আমার মনে হয়, যেন এই মুহূর্তেই সেখানে ফিরে গিয়ে সেই জান্নাতসম পরিবেশে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। সব মিলিয়ে আমরা সেদিন প্রায় ১,০০০টি ছবি তুলেছিলাম। হয়তো সব ছবিই উইকিমিডিয়া কমন্সে অন্তর্ভুক্ত করার মতো নয়, কিন্তু প্রতিটি ছবিই প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাসে আঁকা আমাদের গল্পের এক একটি স্মারক হয়ে থাকবে।

ভবিষ্যতে কেউ যদি এমন কোনো ফটোওয়াক করতে চান, তাহলে তাদের জন্য আমার কয়েকটি পরামর্শ: এমন পোশাক পরবেন, যা আপনার শরীরের যতটা সম্ভব অংশ ঢেকে রাখবে এবং একই সঙ্গে হালকা হবে। পোকারোধী মলম বা এ ধরনের কিছু সঙ্গে থাকলে ভালো হয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত রসদ সঙ্গে রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করবেন। আর অবশ্যই দলবদ্ধভাবে ফটোওয়াকে যাবেন, কারণ একা গেলে বিপদের সম্মুখীন হওয়ার বা নিরাপত্তাহীনতায় পড়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।

পরেরবার হয়তো আমরা অন্য কোনো দারুণ জায়গায় যাব। নতুন অভিজ্ঞতা যুক্ত হবে আমাদের স্মৃতির ক্যানভাসে, আর আমার তোলা ছবিগুলোও সেই ক্যানভাসে নতুন রঙ হয়ে ভেসে উঠবে।

আমাদের ফটোওয়াকের শেষ মুহূর্তে এই ছবিটি তুলেছিলাম। হয়তো খড় ও টুপি একত্রে এমন এক ভাববাদীর মহান দর্শনকে আড়াল করে রেখেছে, যা আমরা কখনোই পুরোপুরি বুঝতে পারব না।
হাসনাত আব্দুল্লাহ, উইকিমিডিয়া কমন্সে সিসি বাই-এস ৪.০ লাইসেন্সে উন্মুক্ত।

Can you help us translate this article?

In order for this article to reach as many people as possible we would like your help. Can you translate this article to get the message out?