১৮৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের রাজশাহী পাবলিক লাইব্রেরি দেশের প্রাচীনতম গ্রন্থাগারগুলোর একটি। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই গ্রন্থাগারে বিপুলসংখ্যক ও বৈচিত্র্যময় বইয়ের সংগ্রহ গড়ে উঠেছে। রাজশাহী পাবলিক লাইব্রেরিতে GLAM প্রকল্পের কাজ শুরু করে যখন আমরা প্রথমবারের মতো সেখানকার পুরোনো বইগুলো হাতে নিই, তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সংগ্রহের অসংখ্য বই অন্তত এক শতাব্দী পুরোনো। সেই মুহূর্তেই আমরা উপলব্ধি করি—মূল্যবান এই ঐতিহাসিক সংগ্রহ সংরক্ষণ, নথিবদ্ধকরণ এবং সবার জন্য উন্মুক্ত করার জন্য রাজশাহী পাবলিক লাইব্রেরিই GLAM উদ্যোগের জন্য একটি আদর্শ স্থান।

মূল বইগুলোর কোনো ক্ষতি না করে কীভাবে এসব মূল্যবান গ্রন্থ সংরক্ষণ করা যায় এবং একই সঙ্গে লাইব্রেরির দেয়ালের বাইরেও এর জ্ঞানকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এই ভাবনা থেকেই রাজশাহী পাবলিক লাইব্রেরিতে উইকিমিডিয়া GLAM প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়, যেখানে আমি Wikimedian in Residence হিসেবে যুক্ত হই। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো পাবলিক ডোমেইনে থাকা বইগুলো শনাক্ত করা, সতর্কতার সঙ্গে সেগুলো ডিজিটাইজ করা এবং উইকিমিডিয়া কমন্স ও বাংলা উইকিসংকলনসহ বিভিন্ন উইকিমিডিয়া প্রকল্পের মাধ্যমে সবার জন্য উন্মুক্ত করা।
রাজশাহী পাবলিক লাইব্রেরিতে GLAM প্রকল্প শুরুর সম্ভাবনা প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধান করা হয় ২৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে, যখন উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের সদস্যরা লাইব্রেরিটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকারী দলে ছিলেন বাংলাদেশের GLAM কার্যক্রমের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মাসুম-আল-হাসান রকি, রাজশাহী উইকিমিডিয়া সম্প্রদায়ের সহকারী সমন্বয়ক মানিক, এবং আমি। এ সময় আমরা লাইব্রেরির সংগ্রহ, সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা এবং উপযুক্ত বইগুলো ডিজিটাইজ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করি। এরপর ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ এবং রাজশাহী পাবলিক লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রস্তাবিত সহযোগিতা নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরিকল্পনাটি পর্যালোচনা করার পর লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ ২ মে ২০২৬ তারিখে GLAM প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করার অনুমতি দেয়। প্রকল্পের প্রথম স্ক্যানিং কার্যক্রম শুরু হয় ৬ মে ২০২৬। CZUR ET25 Pro স্ক্যানার ব্যবহার করে আমি নির্বাচিত বইগুলো স্ক্যান করি। এরপর ব্যক্তিগত ল্যাপটপে স্ক্যান করা ছবিগুলো প্রক্রিয়াজাত করি এবং পরবর্তীতে উইকিমিডিয়া প্রকল্পগুলোতে আপলোডের জন্য প্রস্তুত করি।

প্রতিটি ফাইল প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে পৃষ্ঠার ক্রম, ছবির মান, মেটাডেটা এবং কপিরাইট-সংক্রান্ত তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে হয়। ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়া শুধু বইয়ের পৃষ্ঠা স্ক্যান করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনো বই নির্বাচনের আগে সেটি ভালোভাবে পরীক্ষা করা হয়। বইটি স্ক্যান করার উপযোগী কি না এবং সেটি পাবলিক ডোমেইনে রয়েছে কি না, তা যাচাই করাও এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ৬ মে থেকে ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত আমরা প্রায় ১০০টি বইয়ের ২০,০০০-এরও বেশি পৃষ্ঠা স্ক্যান করেছি। এসব বই উইকিমিডিয়া কমন্সে আপলোড করা হয়েছে এবং বর্তমানে উইকিসংকলনে প্রুফরিডিংয়ের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
উইকিসংকলনের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবীরা স্ক্যান করা পৃষ্ঠাগুলোকে ইউনিকোড টেক্সটে রূপান্তর করতে পারেন, বিভিন্ন ভুল সংশোধন করতে পারেন এবং পুরোনো বইগুলোকে এমন একটি পাঠযোগ্য রূপ দিতে পারেন, যা অনলাইনে সহজে অনুসন্ধান, পড়া ও ব্যবহার করা সম্ভব।

এই কাজের সবচেয়ে কঠিন অংশ স্ক্যানার পরিচালনা করা নয়; বরং কখন একটি বই স্ক্যান করা উচিত নয়, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া। লাইব্রেরির অনেক বইই অত্যন্ত পুরোনো এবং বছরের পর বছর ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। কিছু বই পোকামাকড়ের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার কিছু বইয়ের প্রথম বা শেষের পৃষ্ঠা হারিয়ে গেছে—যেসব পৃষ্ঠায় প্রায়ই লেখকের নাম, প্রকাশের বছর এবং প্রকাশকের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে। এসব তথ্য না থাকলে বইটির কপিরাইটের অবস্থা নিশ্চিত করা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিছু বই এতটাই ভঙ্গুর যে পৃষ্ঠা উল্টানোর সময়ও সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ডিজিটাইজেশনের আগে সংরক্ষণকেই অগ্রাধিকার দিতে হয়।
আগে করা কিছু বাঁধাই বা মেরামতের কাজও নতুন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করেছে। কিছু বই এমনভাবে পুনরায় বাঁধানো হয়েছে যে মলাটের কাছাকাছি মুদ্রিত লেখার কিছু অংশ ঢেকে গেছে। প্রযুক্তিগতভাবে বাঁধাই খুলে প্রতিটি পৃষ্ঠা আলাদাভাবে স্ক্যান করলে সমস্যাটির সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু এভাবে কাজ করতে গেলে ইতোমধ্যে দুর্বল ও ভঙ্গুর বইগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই কারণেই আমরা একটি সহজ নীতি অনুসরণ করি: যে সংগ্রহ সংরক্ষণের জন্য ডিজিটাইজেশন প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে, সেই সংগ্রহের কোনো ক্ষতি কখনোই করা উচিত নয়। ডিজিটাইজেশন সংরক্ষণের একটি মাধ্যম—সংরক্ষণের বিনিময়ে সংগ্রহকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার কারণ নয়।

বই স্ক্যান করার সময় সিলিং ফ্যানের বাতাসে অনেক সময় বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো নড়ে যায়, ফলে স্ক্যান করা ছবিতে ঝাপসাভাব দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর দেশে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে গরমের মৌসুমে ফ্যান ছাড়া কাজ করা অত্যন্ত কঠিন। তাই প্রতিটি বই খুব সতর্কতার সঙ্গে স্ক্যান করতে হয়, যাতে পৃষ্ঠাগুলো স্থির থাকে এবং ছবিগুলো ঝাপসা না হয়।
রাজশাহী পাবলিক লাইব্রেরিতে আমাদের কাজ এখনো চলমান। প্রকল্পের সময় আমরা আরও প্রায় ১০০টি বই শনাক্ত করেছি, যেগুলো ভবিষ্যতে ডিজিটাইজেশনের জন্য উপযোগী হতে পারে। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো লাইব্রেরির সংগ্রহে থাকা ডিজিটাইজেশনের উপযোগী সব পাবলিক ডোমেইন বই সংরক্ষণ করা এবং উইকিমিডিয়ার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সেগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া।তবে আমাদের এই লক্ষ্য শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই প্রকল্প থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের অন্যান্য লাইব্রেরিতেও একই ধরনের GLAM উদ্যোগ গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে। দেশের অনেক লাইব্রেরিতে এমন দুর্লভ ও মূল্যবান সংগ্রহ রয়েছে, যেগুলো এখনো বৃহত্তর বিশ্বের কাছে অজানা। আজ আমরা এই পুরোনো পৃষ্ঠাগুলো সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অতীতের কণ্ঠগুলোকে পৌঁছে দেওয়ার পথ তৈরি করছি—যাতে তারা আগামী দিনেও পড়তে পারে, শিখতে পারে এবং আমাদের অতীতকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারে।
Can you help us translate this article?
In order for this article to reach as many people as possible we would like your help. Can you translate this article to get the message out?
Start translation