রমজান মাসে ঢাকার মসজিদ আল-মুস্তাফায় ইফতার করার অপেক্ষায় শত শত মানুষ দীর্ঘ ও সুশৃঙ্খলভাবে সারিতে বসে আছেন। ওপর থেকে দেখলে এই সমাবেশটি যেন এক জ্যামিতিক বিন্যাসের রূপ নেয়—মসজিদের আলোকিত কেন্দ্রে সমান্তরালভাবে বসে থাকা মুসল্লি ও খাবারের সারি, যার চারপাশে স্থাপত্যের বিস্তৃত বাঁক এবং বাইরের অন্ধকার এক বিশেষ দৃশ্য তৈরি করেছে।
রাকিবুল আলম খানের তোলা এই আলোকচিত্রটি বাংলার প্রেমে উইকি ২০২৬ প্রতিযোগিতার বিজয়ী ছবি। পরিচিত একটি সামষ্টিক ঐতিহ্যকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ধারণ করা ছবিটিতে বিশ্বাস, সম্মিলিত অভিজ্ঞতা এবং দৃশ্যগত সামঞ্জস্য এক ফ্রেমে মিলিত হয়েছে। সুশৃঙ্খল এই সমাবেশটি শুধু ইফতারের একটি দৃশ্য নথিবদ্ধ করেনি; বরং উৎসব ও ধর্মীয় আচার কীভাবে মানুষকে একত্র করে, তারও প্রতিফলন ঘটিয়েছে—যে ভাবনাটি এ বছরের বিজয়ী আলোকচিত্রগুলোর মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে।
বিচারকমণ্ডলী বিশেষভাবে সমাবেশে অংশগ্রহণকারী মানুষের সারি এবং তাঁদের চারপাশের স্থাপত্যের মধ্যকার সম্পর্কের প্রতি আকৃষ্ট হন। বিশ্বরূপ গাঙ্গুলি উল্লেখ করেন, মানুষের সমান্তরাল সারিগুলো কীভাবে স্থাপনার প্রতিসাম্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করেছে। অন্যদিকে, আব্দুল মোমিন ছবিটির স্থাপত্যগত ফ্রেমিং ও কম্পোজিশনের প্রশংসা করেন, যদিও তাঁর মতে সমাবেশের চারপাশের বড় অন্ধকার অংশ ছবিটির সামগ্রিক দৃশ্যগত ভারসাম্য কিছুটা দুর্বল করেছে।
ধর্মীয় আচার, গ্রামীণ উৎসব, লোকঐতিহ্য এবং সামষ্টিক উদ্যাপনকে ধারণ করা অন্যান্য বিজয়ী আলোকচিত্রগুলোর সঙ্গে এই ছবিটি মিলিয়ে বাংলার বিভিন্ন সম্প্রদায় কীভাবে উৎসব পালন করে, উপাসনা করে, একত্রিত হয় এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখে—তার একটি বিস্তৃত দৃশ্যগল্প তুলে ধরে।
উইকি লাভস বাংলা বৃহত্তর উইকি লাভস আন্দোলনের অংশ। এই প্রতিযোগিতা আলোকচিত্রী এবং উইকিমিডিয়া অবদানকারীদের একত্র করে মুক্ত লাইসেন্সের ছবির মাধ্যমে বঙ্গ অঞ্চলের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও দৈনন্দিন জীবন নথিবদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করে। ২০২৪ সালে শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিযোগিতাটি প্রতি বছর বাঙালি জীবনের ভিন্ন একটি দিককে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে একটি সমৃদ্ধ দৃশ্যভিত্তিক সংগ্রহশালা গড়ে উঠছে, যা বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে মুক্তভাবে ব্যবহার, বণ্টন ও পুনঃব্যবহার করা যায়।
২০২৬ সালে উইকি লাভস বাংলার বিষয় ছিল “বাংলার উৎসব”। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের বঙ্গ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক জীবনকে গড়ে তোলা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, সমাবেশ, পরিবেশনা ও ঐতিহ্য নথিবদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়। ধর্মীয় আচার ও লোকজ উৎসব থেকে শুরু করে গ্রামীণ ঐতিহ্য, শোভাযাত্রা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যাপন—এই বিষয়টি বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ কীভাবে একত্রিত হয়, উৎসব পালন করে এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক চর্চাকে টিকিয়ে রাখে, তার একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে।
উইকি লাভস বাংলা আয়োজন করে বাংলা উইকিমৈত্রী, যা বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ কর্মসূচী-এর অধীনে পরিচালিত। এটি উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ উইকিমিডিয়া ব্যবহারকারী দল-এর একটি যৌথ উদ্যোগ। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আঞ্চলিক ঐতিহ্যবিষয়ক আলোকচিত্রগুলো শুধু স্বীকৃতি ও উদ্যাপনের সুযোগই পায় না, বরং মুক্ত লাইসেন্সের অধীনে উইকিমিডিয়া কমন্সে সংরক্ষিত হয়। ফলে এসব ছবি ভবিষ্যতেও উইকিমিডিয়া প্রকল্প, শিক্ষা, গবেষণা, প্রকাশনা এবং সংস্কৃতিবিষয়ক অন্যান্য নথিবদ্ধকরণে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
১৪ এপ্রিল থেকে ১৫ মে ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ বছরের প্রতিযোগিতায় ৩৬৪ জন অংশগ্রহণকারী অংশ নেন, যাদের মধ্যে ২৫৮ জন ছিলেন নতুন অবদানকারী। তারা ২,৮৮৮টি আলোকচিত্র এবং ১৫টি ভিডিও জমা দেন। পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষে উইকি লাভস বাংলা ২০২৬-এর সেরা দশটি আলোকচিত্র নির্বাচিত হয়।
প্রথম স্থান — আত্মসংযমের মুহূর্ত
ওপর থেকে দেখা যায়, ২০২৫ সালের রমজান মাসে ঢাকার মসজিদ আল-মুস্তাফায় ইফতারের জন্য শত শত রোজাদার দীর্ঘ ও সুশৃঙ্খল সারিতে সমবেত হয়েছেন। সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং বাতাসে আজানের ধ্বনি ভেসে উঠলে তারা একসঙ্গে খাবারের সারির চারপাশে বসে ইফতার করেন। মানুষ ও খাবারের দীর্ঘ সারিগুলো একটি আকর্ষণীয় দৃশ্যগত ছন্দ তৈরি করেছে, আর মসজিদের স্থাপত্য ওপর থেকে এই সমাবেশকে সুন্দরভাবে ফ্রেমবন্দী করেছে। জ্যামিতিক প্রতিসাম্যের বাইরে ছবিটি সম্প্রদায় ও সংযোগের একটি বিশেষ মুহূর্তও ধারণ করেছে—যেখানে শত শত মানুষ বিশ্বাস, কৃতজ্ঞতা ও অভিন্ন ঐতিহ্যের বন্ধনে একত্রিত হয়েছেন।
বিচারকমণ্ডলীর মন্তব্যেও ছবিটির দৃশ্যগত সূক্ষ্মতা ও মানবিক ব্যাপ্তির এই ভারসাম্য প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ্বরূপ গাঙ্গুলি উল্লেখ করেন, মানুষের সমান্তরাল সারিগুলো কীভাবে আশপাশের স্থাপত্যের প্রতিসাম্যের প্রতিধ্বনি তৈরি করেছে। আব্দুল মোমিনও ছবিটির ফ্রেমিং ও প্রতিসাম্যের প্রশংসা করেন, যদিও তিনি উল্লেখ করেন যে চারপাশের অন্ধকার অংশ ছবির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।
দ্বিতীয় স্থান — আগুন ও ধোঁয়া

ধোঁয়ার আবছা পর্দার মধ্য দিয়ে সারি সারি প্রদীপ জ্বলছে। নারায়ণগঞ্জের বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রমে রাখের উপবাস, যা কার্তিক ব্রত নামেও পরিচিত, উপলক্ষে ভক্তরা সমবেত হয়েছেন। উপবাস ভাঙার আগে তারা প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনায় অংশ নেন। আগুন, ভক্তি ও সম্মিলিত ধর্মীয় আচারের এক আবহ তৈরি হয় সেখানে। ছবির কেন্দ্রে বসে থাকা উপাসকদের ওপরে একজন দাঁড়ানো ব্যক্তি দৃশ্যমান, চারপাশে অসংখ্য প্রদীপের উষ্ণ আলো। ধোঁয়া পেছনের দৃশ্যকে কোমল করে দিয়েছে এবং পরিবেশে আরও গভীরতা এনেছে। অন্যদিকে, মানুষ ও আলোর পুনরাবৃত্ত সারি ছবিতে ছন্দ ও ব্যাপ্তির এক আকর্ষণীয় অনুভূতি তৈরি করেছে। নাটকীয় আলোকসজ্জার বাইরেও ছবিটি বিশ্বাস ও ভক্তির এক গভীর সামষ্টিক মুহূর্ত ধারণ করেছে।
আব্দুল মোমিন ছবিটির শক্তিশালী আবহ, কেন্দ্রে থাকা আকর্ষণীয় চরিত্র এবং নাটকীয় আলোকসজ্জার প্রশংসা করেন। তার মতে, আলো ছবির রং ও আবহ—উভয়কেই আরও শক্তিশালী করেছে। বিচারকমণ্ডলীর সদস্য টিমোথি এ. গনসালভেসও আগুনের শিখা, ধোঁয়া এবং মানুষের সারির সমন্বয়ে আকৃষ্ট হন। বিশ্বরূপ গাঙ্গুলি একই বিষয়ের আরেকটি ছবিকে বেশি পছন্দ করেছিলেন—যা দেখায়, উচ্চমানের ছবিগুলোর মধ্যেও বিচারকদের পছন্দ কতটা কাছাকাছি হতে পারে।
তৃতীয় স্থান — বৃত্তের ভেতর দুর্গা

একটি ঐতিহ্যবাহী মাটির বাড়ির সামনে সাজানো দুর্গাপূজার প্রতিমার সামনে একটি শিশু টায়ার নিয়ে খেলছে। টায়ারের গোলাকার ফাঁক দিয়ে দেখা যায়, দুর্গার প্রতিমাটি ছবির মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, শিশুটির চলাফেরা দৃশ্যটিতে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিকতা ও আকস্মিকতার অনুভূতি যোগ করেছে।
ছবিটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর অপ্রচলিত দৃষ্টিকোণ। আব্দুল মোমিন প্রশংসা করেন, কীভাবে টায়ারের বৃত্ত দুর্গার প্রতিমাটিকে ঘিরে একটি গভীরতা ও শক্তিশালী বর্ণনামূলক কাঠামো তৈরি করেছে। টিমোথি এ. গনসালভেসও ছবিটির ফ্রেমিং, কম্পোজিশন ও দৃষ্টিকোণের প্রশংসা করেন। অন্যদিকে, বিশ্বরূপ গাঙ্গুলি কিছুটা সংযত মূল্যায়ন দেন। তিনি দৃষ্টিকোণের সৃজনশীলতা স্বীকার করলেও মনে করেন, শিশুটির ভঙ্গি ও চেহারার কিছু উপাদান তার কর্মকাণ্ডকে তুলনামূলকভাবে কম স্বতঃস্ফূর্ত বলে মনে করিয়েছে।
চতুর্থ স্থান — দুর্গার আগমন

শরতের কাশফুলে ভরা মাঠের মধ্য দিয়ে ভক্তদের কাঁধে বহন করে একটি দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ঢাকের ছন্দময় বাদ্যের সঙ্গে এগিয়ে চলা এই শোভাযাত্রা গ্রামীণ বাংলার প্রকৃতি ও ঋতুর এক স্বতন্ত্র আবহ তুলে ধরেছে। নিচু দৃশ্যপট থেকে তোলা ছবিটি দৃশ্যটিতে গতি ও উপস্থিতির অনুভূতি যোগ করেছে।
আব্দুল মোমিন ছবিটির সাংস্কৃতিক গল্প বলার ক্ষমতা, উজ্জ্বল রঙের বৈপরীত্য এবং কাশফুল ও পাহাড়ি ঢাল দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক ফ্রেমের প্রশংসা করেন। তার মতে, নিচু কোণ থেকে তোলা ছবিটি শোভাযাত্রাকে একটি মহৎ ও উৎসবমুখর উপস্থিতি দিয়েছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, দুপুরের তীব্র আলো মুখে গভীর ছাপ তৈরি করেছে এবং দৃশ্যের কিছু খুঁটিনাটি আড়াল করেছে। টিমোথি এ. গনসালভেস ছবিটির কম্পোজিশনকে তুলনামূলকভাবে প্রচলিত বলে মনে করেন। তার মতে, এটি একটি ভালো আলোকচিত্র হলেও এমন কোনো একক উপাদান নেই যা বিশেষভাবে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। একইভাবে, বিশ্বরূপ গাঙ্গুলি মন্তব্য করেন যে ছবির সবকিছু যত্নসহকারে ফ্রেমে স্থাপন করা হলেও গতিশীলতার সীমিত উপস্থিতির কারণে দৃশ্যটি কিছুটা সাজানো বা পরিকল্পিত বলে মনে হয়েছে।
পঞ্চম স্থান — প্রদীপের বৃত্ত

প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে একদল নবদীক্ষিত বৌদ্ধ শ্রমণ ঐতিহ্যবাহী প্রদীপ প্রজ্বালন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। ওপর থেকে দেখা যায়, তারা জ্বলন্ত প্রদীপগুলোকে ঘিরে বসে আছেন এবং তাদের পোশাকের বিন্যাস উষ্ণ আলোর কেন্দ্রকে ঘিরে প্রায় বৃত্তাকার একটি আকৃতি তৈরি করেছে।
ছবিটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের একটি বড় অংশ এসেছে ওপর থেকে তোলা এই দৃষ্টিকোণ থেকে। আব্দুল মোমিন ছবিটির কম্পোজিশন, মৃদু আলোকচ্ছটা, প্রতিসাম্য এবং দৃশ্যের গল্প বলার ক্ষমতার প্রশংসা করেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ছবির ওপরের ডানদিকে থাকা অতিরিক্ত মোমবাতিগুলো মূল বৃত্তাকার বিন্যাস থেকে কিছুটা মনোযোগ সরিয়ে নেয়। একইভাবে, বিশ্বরূপ গাঙ্গুলি মনে করেন, ফ্রেমের ওপরের দিকে প্রদীপের পৃথক বর্গাকার বিন্যাসটি মূল কেন্দ্রীয় কম্পোজিশন থেকে দর্শকের মনোযোগ বিচ্যুত করেছে।
ষষ্ঠ স্থান — নামাজরতদের জনসমুদ্র

দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজের জন্য হাজার হাজার মুসল্লি সমবেত হয়েছেন। ওপর থেকে দেখা এই বিশাল সমাবেশ যেন রঙের এক বিস্তৃত প্রান্তর তৈরি করেছে। আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী, ৬ লাখেরও বেশি মুসল্লি ঈদুল ফিতরের জামাতে অংশ নিয়েছিলেন। ছবিটিতে প্রথমেই যে বিষয়টি নজর কাড়ে, তা হলো এর ব্যাপকতা। একেকজন মুসল্লি এখানে একটি বিশাল, ছন্দময় সমাবেশের অংশ হয়ে উঠেছেন, যা পুরো ফ্রেমজুড়ে বিস্তৃত।
আব্দুল মোমিন আকাশ থেকে তোলা দৃষ্টিকোণ এবং রঙ ও আকৃতির আকর্ষণীয় পুনরাবৃত্তির প্রশংসা করেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ছবির হোয়াইট ব্যালান্সে নীলচে-গোলাপি আভা দৃশ্যটি থেকে সামান্য মনোযোগ সরিয়ে নেয়। টিমোথি এ. গনসালভেস মনে করেন, এত বিপুলসংখ্যক মুসল্লিকে একসঙ্গে ফ্রেমে রাখার সিদ্ধান্তই ছবিটিকে তাৎক্ষণিকভাবে শক্তিশালী দৃশ্যগত প্রভাব দিয়েছে। আর বিশ্বরূপ গাঙ্গুলির মতে, ড্রোন থেকে তোলা দৃষ্টিকোণটি পুরো জামাতকে একটি “মানব মোজাইক”-এ রূপ দিয়েছে—সুশৃঙ্খল এই বিন্যাস উৎসবটির এক শক্তিশালী দৃশ্যগত প্রকাশ হয়ে উঠেছে।
সপ্তম স্থান — করমের নৃত্য
পুরুলিয়ায় বর্ষার শেষে পালিত ঐতিহ্যবাহী করম পরব উপলক্ষে করম দেবতার পূজায় ভক্তরা সমবেত হয়েছেন। রং ও গতিশীলতায় ভরা এই ছবিতে অঞ্চলটির সম্প্রদায়ভিত্তিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এই উৎসবের প্রাণবন্ত পরিবেশ ফুটে উঠেছে।
আব্দুল মোমিন ছবিটিকে শক্তি ও ঐতিহ্যে ভরপুর একটি প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক দৃশ্য হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে তিনি কিছু ক্রোম্যাটিক অ্যাবেরেশন এবং অতিরিক্ত উজ্জ্বল অংশে বিস্তারিত কিছুটা হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন। টিমোথি এ. গনসালভেস সাংস্কৃতিক নৃত্যের রঙিন উপস্থাপনাটিকে বিশেষভাবে প্রশংসা করেন। বিশ্বরূপ গাঙ্গুলি ছবিটির গতিশীলতার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন। তার মতে, এটি একটি প্রাণবন্ত অ্যাকশন আলোকচিত্র, যা একটি বাস্তব গ্রামীণ পরিবেশের মধ্যে নৃত্যের প্রাণ ও উদ্দীপনাকে ধারণ করেছে।
অষ্টম স্থান — গাজনের মুখ
অন্যান্য বিজয়ী আলোকচিত্রের অনেকগুলোতে যেখানে বড় সমাবেশ বা আনুষ্ঠানিক পরিসরকে তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে এই ছবিটি বিষয়ের একেবারে কাছে চলে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের গাজন উৎসবে একজন পরিবেশকের মুখ পুরো ফ্রেমজুড়ে রয়েছে। চারপাশে উজ্জ্বল রং ও গতির রেখা। কাছ থেকে তোলা এই দৃষ্টিকোণ মেকআপ, পোশাক ও মুখের অভিব্যক্তিকে ছবিটির দৃশ্যগত ভাষায় পরিণত করেছে। আর ধীর শাটার ব্যবহার করে মুখের ওপর তৈরি করা আলোর রেখাগুলো ছবিতে ছন্দ ও আরও শক্তিশালী গতিশীলতার অনুভূতি যোগ করেছে।
আব্দুল মোমিন ক্লোজ-আপের প্রশংসা করেন, বিশেষ করে এর গতিশীল আলোর রেখা ও সমৃদ্ধ রঙের ব্যবহারকে। বিশ্বরূপ গাঙ্গুলি ছবিটিকে একটি স্বতঃস্ফূর্ত উৎসবের প্রতিকৃতি হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, মুখের অভিব্যক্তি তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ হলেও ধীর শাটারের কারণে তৈরি গতির ঝাপসা ভাব ছবিটিতে গতি ও স্বতঃস্ফূর্ততার একটি বিশ্বাসযোগ্য অনুভূতি তৈরি করেছে।
নবম স্থান — পলো দিয়ে মাছ ধরা

পাবনার ভাঙ্গুড়ার অগভীর জলাভূমিতে পলো বাওয়া উৎসব উপলক্ষে শত শত জেলে ও গ্রামবাসী একসঙ্গে এগিয়ে চলেছেন। এই ঐতিহ্যের কেন্দ্রে রয়েছে পলো—ঘণ্টা বা শঙ্কুর মতো আকৃতির একটি মাছ ধরার সরঞ্জাম, যা ঐতিহ্যগতভাবে বাঁশ বা বেত দিয়ে তৈরি করা হয়। মাছ ধরার সময় দলবদ্ধভাবে মানুষ পানিতে নেমে পলো ব্যবহার করে মাছ ধরেন। এভাবে একটি প্রাচীন মাছ ধরার পদ্ধতি রূপ নেয় বৃহৎ এক সামষ্টিক আয়োজনে। একই সঙ্গে দৃশ্যটি বাংলার চিরায়ত গ্রামীণ সংস্কৃতিরও প্রতিফলন ঘটায়—যেখানে মানুষের অংশগ্রহণ, স্থানীয় লোকঐতিহ্য এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আলোকচিত্রটি এই কার্যক্রমকে একটি আবহময় প্রাকৃতিক দৃশ্যে রূপ দিয়েছে। আব্দুল মোমিন ছবির নান্দনিক অবয়ব এবং উষ্ণ একরঙা রঙের ব্যবহারকে বিশেষভাবে প্রশংসা করেন। টিমোথি এ. গনসালভেস আলোকসজ্জা ও কম্পোজিশনের দিকটি তুলে ধরেন। অন্যদিকে, বিশ্বরূপ গাঙ্গুলি ছবিটির স্বতঃস্ফূর্ত জনজীবনের মুহূর্ত, কম্পোজিশন এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রাসঙ্গিক উপস্থাপনার প্রশংসা করেন।
দশম স্থান — গতিময় মইছাড়া

সাজানো একজোড়া বলদের পেছনে একজন কৃষক ছুটে চলেছে জলমগ্ন মাঠের ওপর দিয়ে। মইছাড়া উৎসবের সময় বলদগুলো ছুটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে কাদা ও পানি ছিটকে পড়ছে। এই ঐতিহ্যের নাম এসেছে বাংলা শব্দ মই থেকে—চাষের জমি সমতল করার কাজে ব্যবহৃত একটি কৃষি সরঞ্জাম। প্রতিযোগিতার সময় কৃষকেরা একটি মই-এর ওপর দাঁড়িয়ে কাদাময় মাঠের মধ্য দিয়ে একজোড়া বলদ চালান। সাধারণত বর্ষাকালে অনুষ্ঠিত এই আয়োজন গ্রামীণ উৎসবের সঙ্গে কৃষিজীবনের নিবিড় সম্পর্ককে তুলে ধরে। বলদের ছুটে চলা, পানির ছিটকে পড়া এবং দর্শকদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়; বরং বাংলার কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতি, গ্রামীণ ঐতিহ্য এবং মাটির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কেরও প্রতিফলন।
আলোকচিত্রটি সেই উত্তেজনাকে তার সর্বোচ্চ মুহূর্তে ধারণ করেছে। বলদগুলো সামনে ছুটে যাচ্ছে, কৃষক তাদের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে, আর কাদাময় মাঠটিও যেন দৃশ্যটির সক্রিয় অংশ হয়ে উঠেছে। যেখানে বিজয়ী ছবিটির সূচনা স্থিরতা ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে, সেখানে দশম স্থান অধিকারী এই ছবিটি সেরা দশের সমাপ্তি ঘটিয়েছে গতি, পানি ও প্রাণচাঞ্চল্যের মধ্য দিয়ে।
বাংলার জীবন্ত ঐতিহ্যের বিস্তৃত প্রতিচ্ছবি
সবগুলো বিজয়ী আলোকচিত্র একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, বাংলার উৎসবকে কোনো একক সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ করা যায় না। ছবিগুলো রমজানের ইফতার ও ঈদের নামাজ থেকে শুরু করে বৌদ্ধ ধর্মীয় আচার, দুর্গাপূজা, রাখের উপবাস, করম ও গাজন পর্যন্ত বিস্তৃত। অন্যদিকে কোথাও জলাভূমিতে দলবদ্ধভাবে মাছ ধরার দৃশ্য, আবার কোথাও বর্ষার মাঠে বলদ নিয়ে কৃষকদের প্রতিযোগিতা। কিছু ছবিতে হাজারো মানুষের সমাবেশ, আবার কিছু ছবিতে ছোট একটি দল কিংবা একটি মাত্র মুখের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।
এই বৈচিত্র্যই ছিল উইকি লাভস বাংলা ২০২৬ প্রতিযোগিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। জমা পড়া আলোকচিত্রগুলো বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের উৎসব নথিবদ্ধ করেছে এবং আচার, পোশাক, পরিবেশ, লোকঐতিহ্য ও মানুষের অংশগ্রহণের নানা পার্থক্য তুলে ধরেছে।
উইকি লাভস বাংলা এসব ছবিকে শুধু প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেই দেখে না। প্রতিযোগিতায় জমা দেওয়া আলোকচিত্রগুলো Creative Commons Attribution-ShareAlike 4.0 International (CC BY-SA 4.0) লাইসেন্সের অধীনে প্রকাশিত হয়। ফলে এগুলো উইকিমিডিয়ার বিভিন্ন প্রকল্প, শিক্ষা, গবেষণা, প্রকাশনা এবং সাংস্কৃতিক নথিবদ্ধকরণের অন্যান্য কাজে পুনর্ব্যবহার করা যায়।
এখানেই এই সংগ্রহের দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি উৎসব হয়তো মাত্র একদিন, এক সন্ধ্যা কিংবা একটি মৌসুমব্যাপী স্থায়ী হয়; কিন্তু সঠিকভাবে নথিবদ্ধ একটি আলোকচিত্র সেই মুহূর্ত পেরিয়ে যাওয়ার বহু পরেও তার গল্প সংরক্ষণ ও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।
উইকি লাভস বাংলা ২০২৬-এর সেরা দশটি আলোকচিত্র একসঙ্গে বাংলার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উৎসব, সমাবেশ, প্রার্থনা, শ্রম ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার নানা মুহূর্ত ও স্থানকে একত্র করে একটি বিস্তৃত দৃশ্যভিত্তিক নথি তৈরি করেছে।
উইকি লাভস বাংলা ২০২৬-এর বিজয়ী ও চূড়ান্ত পর্বের নির্বাচিত আলোকচিত্রগুলো দেখুন।
Can you help us translate this article?
In order for this article to reach as many people as possible we would like your help. Can you translate this article to get the message out?
Start translation


