সিলেটি উইকিপিডিয়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল এমন একটি ভাষার জন্য ডিজিটাল জ্ঞানভাণ্ডারে স্থান তৈরি করার দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা হিসেবে, যে ভাষা অনলাইনে দীর্ঘদিন প্রায় অনুপস্থিত ছিল। অনলাইনে ভাষাটিকে প্রথম প্রস্তাবের এক দশকেরও বেশি সময় পর প্রকল্পটি এখন আরও বিস্তৃত একটি উদ্যোগে পরিণত হয়েছে—যেখানে ভাষা সংরক্ষণ, শিক্ষা, স্থানীয় ইতিহাস ও উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চাকে কেন্দ্র করে একটি সম্প্রদায়ভিত্তিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে।
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ সিলেটি উইকিপিডিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত হয়। অনেকের কাছে নতুন কোনো উইকিপিডিয়া ভাষা সংস্করণের যাত্রা শুরু হওয়া হয়তো একটি প্রযুক্তিগত মাইলফলক—নতুন একটি ওয়েবসাইট, নতুন একটি ভাষা কোড এবং ক্রমবর্ধমান সংখ্যক নিবন্ধ। কিন্তু সিলেটি সম্প্রদায়ের কাছে এই মুহূর্তটির তাৎপর্য ছিল আরও অনেক গভীর।
এটি ছিল এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা একটি যাত্রার মাহেন্দ্রক্ষণ। এই যাত্রার শুরুতে উইকিমিডিয়ানরা সিলেটি ভাষার জন্য একটি ডিজিটাল জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেন। সিলেটি উইকিপিডিয়ার প্রস্তাবটি ২০১৪ সালে উত্থাপিত হয়। বছরের পর বছর সম্প্রদায়ের নিরলস কাজের পর ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। এর কিছুদিন পরই ঐতিহ্যবাহী সিলেটি নাগরি লিপি ব্যবহার করে উইকিপিডিয়াটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
আজ সিলেটি উইকিপিডিয়া ডিজিটাল বিশ্বে ঐতিহাসিকভাবে কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে উইকিমিডিয়া সম্প্রদায় কীভাবে কাজ করতে পারে—সে বৃহত্তর আলোচনারও একটি অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বকোষের চেয়েও বেশি কিছু
বাংলাদেশ, ভারত সহ বিশ্বের নানা প্রান্তে সিলেটি ভাষায় কথা বলা লক্ষ লক্ষ মানুষ বসবাস করেন। তবুও দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক ডিজিটাল জ্ঞানভাণ্ডারে ভাষাটির উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত। তাই সিলেটি উইকিপিডিয়া প্রকাশ করা কেবল একটি ভাষায় জ্ঞান অনুবাদের বিষয় ছিল না। এর লক্ষ্য ছিল ভাষাটির নিজস্ব পরিসরে জ্ঞান সৃষ্টি, সংগঠিত ও ভাগাভাগি করার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা।
এই প্রকল্পটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ঐতিহ্যবাহী নাগরি লিপির ব্যবহার। এর মাধ্যমে প্রকল্পটি শুধু অনলাইনে সিলেটি ভাষার উপস্থিতিই নিশ্চিত করছে না, বরং ভাষাটির লিখিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ-এর দৃশ্যমানতাও ধরে রাখতে সহায়তা করছে।
প্রথম বর্ষপূর্তিতে এসে প্রকল্পটির সঙ্গে বাংলাদেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অবদানকারীরা যুক্ত হন এবং নিবন্ধের সংখ্যা সহস্রাধিক ছাড়িয়ে যায়। তাই এই বর্ষপূর্তি কেবল একটি মাইলফলক উদ্যাপনের উপলক্ষ ছিল না; বরং ভবিষ্যতে প্রকল্পটি কীভাবে আরও বিস্তৃত হতে পারে, তা নিয়ে ভাবারও সুযোগ তৈরি করে।
প্রথম বর্ষপূর্তি উদ্যাপন ও ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলা
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সিলেটি উইকিমিডিয়ান, ভাষাপ্রেমী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সিলেটের আরটিএম আল কবির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে সমবেত হন সিলেটি উইকিপিডিয়ার প্রথম বর্ষপূর্তি উদ্যাপন করতে।
অনুষ্ঠানে প্রকল্পটির অর্জন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং কোন একটি অঞ্চলের স্থানীয় ভাষায় জ্ঞানভিত্তিক রিসোর্স তৈরির বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি, নতুন অবদানকারীদের নিবন্ধ তৈরি ও সম্পাদনার সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে একটি হাতে-কলমে সম্পাদনা কর্মশালারও আয়োজন করা হয়।
এই উদ্যাপন সম্প্রদায়টির কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা একটি বার্তাকে আরও দৃঢ় করেছে: সিলেটি উইকিপিডিয়া শুধু একটি অনলাইন বিশ্বকোষ নয়। অনেক অবদানকারীর কাছে এটি ডিজিটাল যুগে সিলেটি ভাষা ও সংস্কৃতির উপস্থিতি সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করার একটি চলমান প্রচেষ্টার প্রতীক।
বর্ষপূর্তির এই আয়োজন সংখ্যালঘু ভাষার উইকিমিডিয়া সম্প্রদায়গুলোর ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছে। একটি ভাষার উইকিপিডিয়া সংস্করণ তৈরি করা কাজের কেবল একটি অংশ। সেটিকে টেকসই করে তুলতে প্রয়োজন অবদানকারী, অংশীদারত্ব, শিক্ষামূলক কার্যক্রম এবং এমন পরিসর, যেখানে মানুষ একে অপরের কাছ থেকে শিখতে পারে। এই প্রেক্ষাপটেই উইকি লাভস সিলটোলজি নামের একটি সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের ভিত্তি গড়ে উঠতে শুরু করে।
উইকিমিডিয়া মিটআপ থেকে শিক্ষামূলক আন্দোলন
Wiki Loves Sylotology-এর যাত্রা শুরু হয় ৯ এপ্রিল ২০২৫-এ অনুষ্ঠিত একটি সিলেট উইকিমিডিয়া কমিউনিটি মিটআপের ঠিক পরেই। উক্ত আলোচনায় এই অঞ্চলে উইকিমিডিয়ার কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে উন্মুক্ত জ্ঞান সৃষ্টি ও ভাগাভাগির কাজে যুক্ত হতে পারে, তা নিয়ে আগ্রহী বিভিন্ন ব্যক্তি একত্রিত হন।
এই ভাবনা থেকেই গড়ে ওঠে ‘উইকি লাভস সিলটোলজি’ [Wiki Loves Sylotology] (Sylhetology)—সিলেটের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল ও ঐতিহ্যকে অনুসন্ধান ও নথিবদ্ধ করতে উইকিমিডিয়ার বিভিন্ন প্রকল্প ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি শিক্ষামূলক আন্দোলন।
সিলেটের Springfield School-এ এই উদ্যোগের শিক্ষামূলক কার্যক্রম সর্বপ্রথম শুরু হয়। সেখানে অবদানকারী, শিক্ষক ও গবেষকেরা বাংলা, ইংরেজি ও সিলেটি উইকিপিডিয়ার পাশাপাশি অন্যান্য উইকিমিডিয়া প্রকল্প ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের নিজেদের অঞ্চল সম্পর্কে জ্ঞানচর্চায় কীভাবে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে কাজ করেন।
উচ্চশিক্ষায় সিলটোলজির প্রয়োগ
১৫ আগস্ট ২০২৬ সিলেটের আরটিএম আল কবির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে উইকি লাভস সিলটোলজি নিয়ে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
বেলা ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত (BST) অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় সিলেট-সম্পর্কিত জ্ঞান নথিবদ্ধ ও সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে উইকিমিডিয়ার বিভিন্ন প্রকল্প কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে আগ্রহীদের সাথে কথা বলা হয়।
সিলটোলজিস্ট ড. মোহাম্মদ রহমান-এর সঙ্গে আমি (আবু সাঈদ) যৌথভাবে কর্মশালাটি পরিচালনা করি। কর্মশালায় সিলেটের ভাষা, ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির অধ্যয়নের সঙ্গে উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চার ব্যবহারিক সম্ভাবনাগুলোকে যুক্ত করা হয়।
উইকিমিডিয়ার বিভিন্ন প্রকল্পে জ্ঞানকে সংযুক্ত করা
উইকি লাভস সিলটোলজি-এর অন্যতম মূল ধারণা হলো—কোনো একটি অঞ্চল সম্পর্কে জ্ঞানকে একটি মাত্র প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা।
যেমন- সিলেটের ইতিহাস নিয়ে একটি নিবন্ধ উইকিপিডিয়ায় তৈরি করা যেতে পারে। মানুষ, স্থান ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কাঠামোবদ্ধ তথ্য উইকিডাটায় সংগঠিত করা যায়। ঐতিহাসিক বই ও গ্রন্থ উইকিসোর্সে সংরক্ষণ করা যায়। আর ছবি, অডিও রেকর্ডিং ও ভিডিও উইকিমিডিয়া কমন্সে শেয়ার করা যায়।
সমন্বিতভাবে এসব প্রকল্প একটি সম্প্রদায়ের আরও সমৃদ্ধ ও পরস্পর-সংযুক্ত নথি তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। সিলেটের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে।
এই অঞ্চলে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভাষা-সম্পর্কিত বিপুল জ্ঞান রয়েছে—যার অনেকটাই এখনো বই, মৌখিক ঐতিহ্য, ব্যক্তিগত সংগ্রহ এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে আছে। এসব জ্ঞান আরও সহজলভ্য করতে শুধু ডিজিটাইজেশনই যথেষ্ট নয়; এর জন্য এমন মানুষও প্রয়োজন, যারা এই জ্ঞান নিয়ে গবেষণা, নথিবদ্ধকরণ ও প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার কাজ করতে পারেন।
উইকি লাভস সিলটোলজির লক্ষ্য হলো এসব বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একত্র করা—উইকিমিডিয়ান, শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, স্থানীয় জ্ঞানধারক এবং স্বেচ্ছাসেবকদের।
মুরারিচাঁদ কলেজে সমাবেশ
এই চলমান সম্প্রদায় গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ২৯ আগস্ট ২০২৬-এও দৃশ্যমান হয়, যখন সিলেটি উইকিমিডিয়ানরা সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজে একত্রিত হন। মিটআপে দুটি পরস্পর-সম্পর্কিত বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল—Wiki Loves Sylotology এবং বাংলা উইকিসম্মেলন ২০২৬-কে ঘিরে পরিকল্পনা ও সমন্বয়।

অংশগ্রহণকারীরা সিলেটি অবদানকারীদের মধ্যে সহযোগিতা কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায় এবং এই অঞ্চলের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কিত জ্ঞান নথিবদ্ধ ও ভাগাভাগি করতে উইকিমিডিয়ার বিভিন্ন প্রকল্প কীভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি, উইকিমিডিয়া আন্দোলনের মধ্যে সিলটোলজি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ভিত্তিক কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়াও এই মিটআপের অন্যতম লক্ষ্য ছিল।
মুরারিচাঁদ কলেজ সিলেটের ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ডিজিটাল জ্ঞানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে এই ঐতিহাসিক শিক্ষাঙ্গনে একত্র হওয়ার মধ্য দিয়ে সিলেটের শিক্ষার ইতিহাসের সঙ্গে ডিজিটাল যুগের উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চার সম্ভাবনার একটি সংযোগ তৈরি হয়। আলোচনায় বিভিন্ন প্রকল্পের পাশাপাশি একাধিক ভাষারও ব্যবহার দেখা যায়, যা এই সম্প্রদায়ের বহুভাষিক চরিত্রকে প্রতিফলিত করে। সিলেটের গল্প বিভিন্ন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে সিলেটি, বাংলা ও ইংরেজি—তিনটি ভাষারই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
একটি ওয়েবসাইটের গণ্ডি পেরিয়ে বেড়ে ওঠা একটি আন্দোলন
সিলেটি উইকিপিডিয়ার গল্প ক্রমেই একটি বৃহত্তর ইকোসিস্টেমের গল্পে পরিণত হচ্ছে। একটি ভাষায় উইকিপিডিয়া সংস্করণ সেই ভাষায় জ্ঞানচর্চার একটি নিজস্ব পরিসর তৈরি করতে পারে। কিন্তু মিটআপ অবদানকারীদের একত্র করতে পারে। শিক্ষামূলক কার্যক্রম নতুন প্রজন্মকে উইকিমিডিয়ার সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে পারে। অংশীদারত্ব ঐতিহাসিক উপকরণ সংরক্ষণে সহায়তা করতে পারে। আর বিভিন্ন প্রকল্পে সমন্বিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে লেখা, তথ্য, ছবি ও সাংস্কৃতিক নথিকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব।
২০১৪ সালে শুরু হওয়া একটি প্রস্তাব থেকে ২০২৬ সালে প্রথম বর্ষপূর্তি উদ্যাপন করা একটি ক্রমবর্ধমান সম্প্রদায়ে সিলেটি উইকিপিডিয়ার এই যাত্রা দেখায় যে, দীর্ঘমেয়াদি স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ কতটা পরিবর্তন আনতে পারে। Wiki Loves Sylotology-এর আবির্ভাব সেই যাত্রার পরবর্তী ধাপকে তুলে ধরে। এটি আরও বিস্তৃত একটি প্রশ্ন সামনে আনে: একটি উইকিমিডিয়া ভাষা সম্প্রদায় যখন শুধু একটি বিশ্বকোষ তৈরির গণ্ডি পেরিয়ে উন্মুক্ত জ্ঞানকে শিক্ষা, স্থানীয় ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করতে শুরু করে, তখন কী ঘটে?
এই গল্প এখন লেখা হচ্ছে নিবন্ধ ও ডেটাসেটে, শ্রেণিকক্ষ ও কর্মশালায়, আলোকচিত্র ও ঐতিহাসিক নথিতে এবং এমন মানুষদের পারস্পরিক আলোচনায়—যারা বিশ্বাস করেন, তাদের ভাষা ও সম্প্রদায় সম্পর্কে জ্ঞানেরও বিশ্বের অভিন্ন ডিজিটাল কমন্সে একটি যথাযথ স্থান থাকা উচিত।
Can you help us translate this article?
In order for this article to reach as many people as possible we would like your help. Can you translate this article to get the message out?
Start translation